সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

হৃদরোগ প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন

বিশ্বের এক নম্বর মরণব্যাধি হৃদরোগ। কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই যেকোনো সময় এটি কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। বিশ্বের মোট মৃত্যুর অর্ধেকই হয় হার্টের রোগ ও স্ট্রোকে। প্রতি বছর লাখ লাখ লোকের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। তাদের মধ্যে ২৫ ভাগের মৃত্যু হয় হাসপাতালে পৌঁছার আগেই। হার্ট অ্যাটাক হয়েও অনেক সময় বেঁচে থাকতে হয় নানা অক্ষমতা আর হঠাৎ মৃত্যুর ভয় নিয়ে।

বাংলাদেশে ৩০ বছর বয়সের পর হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়; ৪০-৪৫ ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের হৃদরোগ তো অজানা নয়। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট সমপ্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজনের হার্টের সমস্যা আছে। তাদের সমস্যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরো জটিল হয়। তারা আরো জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে ১৫-২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের স্বাস’্য সচেতনতার অভাব যতই থাকুক না কেন রোগভীতি এবং এ থেকে মৃত্যুভয় কিন’ কম নয়।

বাংলাদেশে হৃদরোগ বাড়ার কারণ
বর্তমানে আমাদের জীবন ধারায় পশ্চিমা ধাঁচে পরিবর্তন হচ্ছে। ফাস্টফুডের সাথে দ্রুততালে বাড়ছে ফ্যাট খাওয়ার প্রবণতা। কমেছে শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস ও টাটকা খাবার খাওয়ার ঝোঁক।
জীবনের গতি বাড়তে বাড়তে জেটগতির জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে একশ্রেণীর মানুষ। ফলে ইঁদুর-দৌড়ের জীবনে বাড়ছে টেনশন, মানসিক চাপ, মন হয়ে পড়ছে ক্ষত-বিক্ষত, হৃদরোগ বেড়ে চলছে এভাবে।

অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে চলছে ধূমপান। এর বিপক্ষে সচেতনতা সৃষ্টি ও মোটিভেশনও যেন রুখতে পারছে না এর অগ্রযাত্রাকে। ধূমপান এখন আর শুধু বড়দের সঙ্গী নয়, ছোটদেরও বন্ধু। অতীতে বাঙালি ছিল কর্মমুখর, পরিশ্রম নির্ভরতায় চলছিল জীবন। জীবনযাপনের এ পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে মানুষ। গ্রামের একশ্রেণীর মানুষ এখন মোটসাইকেলে চড়েন বেশি, সাইকেলে চড়েন কম, হাঁটেন আরো কম। শহরাঞ্চলে লাফ দিয়ে বাড়ছে গাড়িচড়া, বসে বসে কাজ করা এবং আয়েশি জীবনযাপনের মানসিকতা। কমছে শরীরের ব্যায়াম, বাড়ছে স’ূলতা। ব্যায়াম মানে তো হার্টরেট উঠবে ১৪০-এ আর ঘাম ঝরবে টপটপ করে।

প্রচলিত চিকিৎসা
রক্তনালীতে ব্লক ধরা পড়লে অ্যানজিওপ্লাস্টি বা করোনারি বাইপাস সার্জারি করা হয়। উভয় পদ্ধতি বেশ খরচসাপেক্ষ এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াযুক্ত। দেখা যায়, কয়েক বছর পর আবারো ব্লক দেখা যায়। তা ছাড়া সার্জারির পর রোগীর জীবনীশক্তি অর্ধেকে নেমে আসে। যে হারে হৃদরোগের সংখ্যা বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না নির্ভরযোগ্য অ্যানজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারির সেন্টারের সংখ্যা। এভাবে বাড়তে থাকলে আগামীতে হৃদরোগ চিকিৎসার হাসপাতাল ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কয়েক গুণ বেশি প্রয়োজন হবে, যা রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেয়া, তবে এ রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ও নিয়মিত ওষুধ খেলে এর জটিলতা বহুলাংশে এড়ানো সম্ভব।

খাদ্যের মাধ্যমে কোলেস্টেরল ও চর্বি গ্রহণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলে এটা এক দিকে যেমন নতুন ব্লকেজ সৃষ্টি রোধ করবে, অন্য দিকে তেমনি ধমনীতে জমে থাকা মেদকেও অপসারণ করবে। চিন্তার বিষয় হলো হৃদরোগ চিকিৎসায় আধুনিক নিরাময় প্রযুক্তি, যেমন বাইপাস সার্জারি বা অ্যানজিওপ্লাস্টি বিফলে যায় শুধু নতুন নতুন ব্লকেজ সৃষ্টি এবং অপারেশনের পর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেই।

বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। হৃদযন্ত্রের ধমনীতে ব্লকেজ সৃষ্টির কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। দেখা গেছে যে, ব্লকেজ সৃষ্টি যে কারণে হয় সেই সমস্যার সমাধান না করেই অস্ত্রোপচারের চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। এই সূত্র ধরেই নতুন ধরনের চিকিৎসার পথ খোঁজা হতে থাকে। গবেষণা করেই হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই সামপ্রতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ মিলেছে।
কী সেই মুক্তির পথ?
শুধু নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আর কিছু নিয়ম অনুসরণ করলেই কঠিনতর হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটাকেই বলা হচ্ছে করোনারি আর্টারি ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড রিগ্রেশন প্রোগ্রাম বা সংক্ষেপে ‘সিএডি পিআর’। কোনো ওষুধ গ্রহণ ছাড়াই কেবল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারণে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ এনে হৃদরোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ এবং নিরাময় করা সম্ভব।

চিকিৎসা যখন ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়া
১৯৮৮ সালে ডা: অরনিসের অবদানের কথা বিশ্ববাসী জানতে পারেন। তিনি করোনারি আর্টারি রোগে আক্রান্ত কিন’ বাইপাস সার্জারি করতে রাজি হচ্ছেন না এমন রোগীদের দু’টি গ্রুপে ভাগ করেন- প্রথম গ্রুপের রোগীদের চিকিৎসা শুরু করেন কম ফ্যাট ও বেশি আঁশযুক্ত খাবার দিয়ে, এ ছাড়া স্ট্রেসমুক্ত থাকার পদ্ধতি, প্রাণায়াম-যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করার উপদেশ ও দীক্ষা দেন। অপর গ্রুপকে দেয়া হলো

হৃদরোগে সচরাচর ব্যবহৃত ওষুধ।
এই দুই গ্রুপের রোগীদেরই বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। কিছু দিন পর পর রোগীর অগ্রগতি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো। পাওয়া গেল অদ্ভুত ফল। ডা: অরনিসের আবিষ্কৃত পদ্ধতি যারা অনুসরণ করেছেন তাদের ধমনীতে জমে থাকা চর্বি বা কোলেস্টেরল পরিষ্কার হয়ে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তারা ভীতিকর বুকব্যথা থেকে মুক্তি পান এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমে আসে।

অপর দিকে দ্বিতীয় দলের রোগীদের অবস’া আগের অবস’ায় থেকে গেল অর্থাৎ অবস’ার কোনো উন্নতি হলো না। কারো কারো ক্ষেত্রে অবস’ার অবনতি হলো।

লেখক : ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস, সহযোগী অধ্যাপক, হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, পান’পথ, ঢাকা।