সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

হার্ট ফেইলিয়র

সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও প্রতিনিয়ত হার্ট ফেইলিয়রের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশ থেকে বিশ বছর পর হৃদরোগীদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী হার্ট ফেইলিয়রে আক্রান্ত হবেন। কারণ হিসাবে ধরা হচ্ছে, আধুনিক চিকিত্সার ফলে হৃদরোগীরা যদিও অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন, বিশেষ করে হৃিপণ্ডের রক্তনালির রোগ থেকে, তবুও পরে তারাই হার্ট ফেইলিয়রে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

আমাদের দেশে হার্ট ফেইলিয়র চিকিত্সার জন্যে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল, এমনকি বড় হাসপাতালগুলোতে হার্ট ফেইলিয়রের জন্যে কোনো আলাদা ওয়ার্ড পর্যন্ত নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে বিশেষায়িত ওয়ার্ড এবং বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তৈরি হচ্ছেন।

হার্ট ফেইলিয়র কী?
হার্ট মানুষের গোটা শরীরে রক্তপ্রবাহ নিশ্চিত করে থাকে। হার্টের কাজ হচ্ছে রক্ত পাম্প করে রক্তনালিতে সঞ্চালন করা, যার জন্য হার্টকে একটি বায়োলজিক্যাল পাম্প বলা হয়ে থাকে। কাজকর্মের তারতম্য অনুযায়ী মানুষের শরীরে রক্তের প্রবাহের প্রয়োজনীয়তা কমবেশি হয়ে থাকে। হার্ট প্রতি মুহূর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী সারা শরীরে রক্তসঞ্চালন করে থাকে। কোনো কারণে হার্ট শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্তসঞ্চালন করতে ব্যর্থ হলে এই অবস্থাকে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় হার্ট ফেইলিয়র বলা হয়ে থাকে।

সাধারণ মানুষ কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে হার্ট ফেইলিয়র বলা হয়ে থাকে। আসলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং হার্ট ফেইলিয়র—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। এখানে এই তিনটি বিষয়ে কিছু ধারণা দেয়া যেতে পারে—হার্ট ফেইলিয়র, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট অ্যারেস্ট।

হার্ট ফেইলিয়র : শারীরিক প্রয়োজনের তুলনায় কম রক্তসঞ্চালনের অবস্থাকে হার্ট ফেইলিয়র বলে।
হার্ট অ্যাটাক : হৃিপণ্ডের রক্তনালি বন্ধ হয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে হৃিপণ্ডের অংশবিশেষ নষ্ট হয়ে যাওয়াকে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট স্ট্রোক বলে।
হার্ট অ্যারেস্ট : কোনো কারণে হঠাত্ হৃিপণ্ড থেমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে হার্ট অ্যারেস্ট বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বলে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে (কয়েক মিনিটের মধ্যে) রোগীর মৃত্যু হয়।

হার্ট ফেইলিয়রের কারণসমূহ
হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতা যে কোনোভাবে যদি এমন পর্যায়ে কমে যায়, যাতে হার্ট শরীরের প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তখন উপরোক্ত অবস্থাকে হার্ট ফেইলিয়র বলা হয়। বহু ধরনের কারণে হার্ট ফেইলিয়র হয়ে থাকে, যেমন—হার্ট দুর্বল হয়ে যাওয়া, শরীরের রক্তপ্রবাহের চাহিদা অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়া এবং খুব বেশি রক্তশূন্যতা হার্ট ফেইলিয়রের অন্যতম তিনটি কারণ।

যেসব কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে থাকে
যেমন হার্ট অ্যাটাক, হার্টের ভাল্বের সমস্যা, হার্টের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস—এসব কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ইসকিমিক হার্ট ডিজিজ (হৃিপণ্ডের রক্তনালির রোগ) ৬০%, তারপর উচ্চ রক্তচাপ ১১%, ধূমপান ১৬%, হৃদপিণ্ডের ভাল্বের সমস্যা (বাতজ্বরজনিত) ১২%।

হার্ট ফেইলিয়রের উপসর্গ
সাধারণভাবে হার্ট ফেইলিয়র খুব ধীরে ধীরে হার্টের অবস্থার অবনতি ঘটায়, যার জন্য রোগী অনেক সময় পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে থাকে। এ অবস্থায় রোগীর হার্ট ফেইলিয়রের উপসর্গগুলো অনুভূত নাও হতে পারে। ধীরে ধীরে যেসব উপসর্গ রোগীর শরীরে দেখা দেয়, তা হচ্ছে শারীরিক দুর্বলতা অনুভূত হওয়া, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, পরে স্বাভাবিক কাজকর্মে ক্লান্তি বোধ করা এবং অবশেষে অল্প পরিশ্রমে রোগীর ক্লান্ত হয়ে যাওয়া। রোগীর শ্বাসকষ্ট হওয়া আরেকটি উপসর্গ। প্রাথমিক অবস্থায় রাতে শোয়ার সময় শ্বাসকষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হাল্কা কাশি থাকতে পারে। অনেক সময় ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে, যার ফলে রোগীর ঘুম ভেঙে যায়, রোগী ঘুম থেকে উঠে বসে বা পায়চারি করে, অনেকে শ্বাসকষ্টের জন্য ঘরের জানালা খুলে বসে থাকে।

বুক ধড়ফড় করা : হার্ট ফেইলিয়রের রোগীরা প্রায় বুক ধড়ফড় করার কথা বলে থাকেন। পরিশ্রমের সময় বুক ধড়ফড় বেড়ে যায়।

শরীরে পানি জমে যাওয়া : প্রাথমিক অবস্থায় রোগীর পেটে পানি জমতে থাকে। পেটে পানি জমার জন্য রোগীর পেট ফেঁপে যায়, হজমে সমস্যা দেখা দেয়, অল্প খেলে পেট ভরে যায়, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়, পেটে অত্যধিক গ্যাস উত্পন্ন হয়ে থাকে। হার্ট ফেইলিয়রের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর হাত, পা ও মুখে পানি জমে; হাত, পা ও মুখ ফুলে যায়। দ্রুত রোগীর শারীরিক ওজন বাড়তে থাকে। এসব উপসর্গের সঙ্গে রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়। হার্ট ফেইলিয়রের তীব্রতা আরও বেশি বাড়লে রোগীর ফুসফুসে পানি জমে যেতে পারে, হার্টের চতুর্দিকেও পানি জমে যেতে পারে। এ অবস্থায় রোগী সাধারণ শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন। রোগীর চলাফেরা, ওঠাবসা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

যদি হৃিপণ্ডের রক্তনালির অসুখের জন্য হার্ট ফেইলিয়র হয়ে থাকে, তবে হার্ট ফেইলিয়রের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর বুকে ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। অল্প পরিশ্রমে রোগীর বুকে তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে। হার্ট ফেইলিয়রের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর কিছু মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়।

রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
হার্ট ফেইলিয়রের কারণ নির্ণয়ের জন্য, তীব্রতা নির্ধারণের জন্য, জটিলতা দেখার জন্য এবং সঠিক চিকিত্সা পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—ইসিজি, বুকের এক্সরে, ইকো-কার্ডিওগ্রাম, রক্তে লবণের পরিমাণ নির্ধারণ (ইলেকট্রোলাইটস), আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, রক্তে চর্বির পরিমাণ নির্ধারণ (লিপিড প্রোফাইল), রক্তের শর্করা নির্ণয় (ব্লাড সুগার), ইটিটি ইত্যাদি।

হার্ট ফেইলিয়রের জটিলতা
সঠিক সময়ে চিকিত্সা গ্রহণ করলে হার্ট ফেইলিয়রের জটিলতা হ্রাস করা যেতে পারে। যেসব রোগী উপযুক্ত চিকিত্সা গ্রহণে ব্যর্থ হয় তাদের খুব বেশি জটিলতা দেখা দেয়। হার্ট ফেইলিয়রের ক্ষেত্রে জটিলতা প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে চিকিত্সা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

জটিলতাগুলো হলো : ১. রেনাল ফেইলিয়র/কিডনি ফেইলিয়র। ২. জীবাণু সংক্রমণ/ইনফেকশন। ৩. ওজন কমে যাওয়া/স্বাস্থ্য ভেঙে হওয়া। ৪. পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়া। ৫. চেস্ট ইনফেকশন/শ্বাসতন্ত্রে জীবাণু সংক্রমণ হওয়া।

হার্ট ফেইলিয়রের চিকিত্সা
— খাদ্যে লবণ গ্রহণের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা।
— উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিত্সার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা।
— চিকিত্সা গ্রহণ করে ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।
— পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে রোগীর খাদ্যাভাস পরিবর্তন করা।

যেমন হাল্কা ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, ব্রিদিং এক্সারসাইজ (শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম) ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং হার্ট ফেইলিয়রের জন্য মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিত্সা গ্রহণ করা। এজন্য অবশ্য কার্ডিওলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।

এখানে বলে রাখা ভালো, খুব অল্পসংখ্যক রোগী ছাড়া বাকিদের হার্ট ফেইলিয়র কোনো চিকিত্সার মাধ্যমেই সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হয় না। তবে আশার কথা হলো সুচিকিত্সার মাধ্যমে হার্ট ফেইলিয়র নিয়ন্ত্রণে রেখে রোগী তার স্বাভাবিক জীবনযাপন অব্যাহত রাখতে পারেন।

ডা. এম শমশের আলী : সহকারী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল