সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

স্ট্রোক: মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ

মস্তিস্কের যে সকল জায়গায় রক্তক্ষরণ হয় তন্মধ্যে সাব অ্যারাকনয়েড স্পেস অন্যতম।  সাবঅ্যারাকনয়েড রক্ত ক্ষরণ বলতে আমরা বুঝি মস্তিস্ক ও তার আবরণীর মধ্যবর্তী স্থানে রক্তক্ষরণ। এই জায়গাটিকে সাবঅ্যারাকনয়েড স্পেস বলা হয়।

মস্তিস্কের রক্তক্ষরণের কারণ

নিম্নলিখিত কারণে ইহা ঘটতে পারে।

  • ধমনী ও শিরার অপগঠন থেকে রক্তক্ষরণ
  • রক্তক্ষরণ সংক্রান্ত শারীরিক গোলযোগ
  • গুরু মস্তিস্কের নাড়ীর স্ফীতি থেকে রক্তক্ষরণ
  • মাথায় আঘাত
  • অজ্ঞাতকারণে
  • রক্ত পাতলাকরণ ওষুধের ব্যবহারে

বৃদ্ধ বয়সে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলে এ ধরনের রক্তক্ষরণ হতে পারে। যুবক বয়সে সাধারণত মটর সাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাপ্ত আঘাতে এ ধরণের রক্তক্ষরণ হতে পারে।

দশ হাজার লোকের মধ্যে ১০-১৫ জনের গুরু মস্তিস্কের নাড়ীর স্ফীতি থেকে এ ধরনের রক্তক্ষরণ হতে পারে। ২০-৬০ বত্সর বয়সের রোগীদের মধ্যে এ ধরনের রক্তক্ষরণ বেশী দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে ইহা পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশী পাওয়া যায়।

ঝুঁঁকিপূর্ণ অবস্থা

  • অন্যান্য ধমনী কিংবা শিরার স্ফীতি
  • রক্তনালীর দূর্বলতা কিংবা স্ফীতির সাথে যদি তন্তু ও পেশীর গঠনগত অস্বাভাবিকতা এবং সংযোজক কলার অসুস্থতা থাকে
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • কিডনির বহু সিস্টযুক্ত অসুখের ইতিহাস থাকলে
  • ধূমপান

যদি পরিবারে রক্তনালী স্ফীতির ইতিহাস থাকে তবে তা ঝুঁকির পরিমান বাড়িয়ে দেয়।

উপসর্গ

প্রধান উপসর্গ হল হঠাত্ করে তীব্র মাথা ব্যথা শুরু এবং এটি মাথার পিছনের দিকে আরও বেশী। রোগী অনেক সময় বলে থাকে এমন তীব্র মাথা ব্যথা জীবনে আর কখনও আগে হয়নি। মাথায় ফটফট বা মটমট শব্দ অনুভব করার পরপরই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যাওয়া।

অন্যান্য উপসর্গ

  • হঠাত্ চেতনা কিংবা সতর্কতা হ্রাস পাওয়া
  • অনুভূতি কিংবা চলাচল কমে যাওয়া বা কঠিন হয়ে পড়া
  • মেজাজ এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন এমন কি মানসিক বিভ্রম ও ক্রোধপ্রবণতা
  • মাংশপেশীর ব্যথা বিশেষকরে ঘাড় ও কাঁধে
  • বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া
  • সূর্যের আলোতে চোখে বিরক্তিবোধ করা
  • খিচুনি
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
  • দৃষ্টিশক্তির সমস্যা একটিকে দুটি দেখা, অন্ধবিন্দু ও সাময়িকভাবে একচোখে দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া।

অতিরিক্ত উপসর্গ

  • চোখের পাতা ঝোলা
  • চোখ, চোখের তারা বিভিন্ন আকারের হতে পারে
  • হঠাত্ পিঠ ও ঘাড় শক্ত হয়ে যেতে পারে এমনকি পিঠ ধনুকের মত বেঁকে যেতে পারে (যদিও এটা বেশী দেখা যায় না)।

রোগীকে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে রোগী যদি সম্পূর্ণ অজ্ঞান না হয়ে থাকে তবে সে ঘাড় নাড়ানোকে বাঁধা দিবে। স্নায়ুতন্ত্র পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, স্নায়ু ও মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা অনেকটা কমে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুবিক ঘাটতি।

চোখে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। চোখের নড়াচড়া কমে গেলে বুঝতে হবে কেন্দ্রীয় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মৃদু অবস্থায় চোখ পরীক্ষা করে কোন সমস্যা পাওয়া যাবে না।

সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণ সন্দেহ করলে প্রথমেই মস্তিস্কের একটি সিটি স্ক্যান করতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান স্বাভাবিক হতে পারে যদি স্বল্প পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। যদি সিটি স্ক্যান স্বাভাবিক হয় তবে কোমারের মেরুদন্ড থেকে ছিদ্র করে রক্ত নিতে হবে। রোগীর যদি সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে তবে এই রসে রক্ত পাওয়া যাবে। মস্তিস্কের কোন রক্তনালীর স্ফীতি আছে কিনা এটা জানতে হলে সিটি স্ক্যান এনজিওগ্রাম করতে হবে।

রক্তনালীর ক্ষুদ্র স্ফীতি দেখার জন্যে সিটি এনজিওগ্রাফীর চেয়ে সেরিব্রাল এনজিওগ্রাফী অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই পরীক্ষা রক্তক্ষরণের জায়গাটি সুক্ষভাবে নির্ণয় করতে পারে এবং এটাও নির্বাচন করা যায় যে, সেখানে রক্তনালীর কোন সংকোচন আছে কি না।  মস্তিস্কের খুলির বাহির থেকে ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড দ্বারা মস্তিস্কের ভিতরের রক্তনালীর প্রবাহ বুঝা যায়। আল্ট্রাসাউন্ড রশ্মি খুলির ভিতর দিয়ে ঢুকে যায়। ইহা রক্তনালীর সংকোচনকেও নির্ণয় করতে পারে এবং এই প্রাপ্ত জ্ঞানকে চিকিত্সার সহায়ক হিসাবে কাজে লাগানো যাবে। সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণ নির্ণয়ে অনেক সময় এমআরআই (MRI) কিংবা এমআরএ (MRA) ব্যবহূত হয়ে থাকে।

চিকিত্সা

চিকিত্সার উদ্দেশ্য হলো- জীবনকে বাঁচানো, রক্তক্ষরণের কারণ মোরমত করা, উপসর্গ উপশম করা এবং জটিলতা যেমন স্ট্রোক প্রতিরোধ করা।  যদি আঘাতজনিত কারণে রক্তক্ষরণ হয় তবে সার্জারী করে জমাট বাধা রক্ত বের করে আনতে হবে বা মস্তিস্কের উপর চাপ কমাতে হবে।  যদি রক্তক্ষরণ রক্তনালীর স্ফীতি ফেঁটে গিয়ে থাকে তবে তা মেরামত করতে হবে। যদি রোগী মুমূর্ষ অবস্থায় থাকে তবে অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না রোগী স্থির হয়। মাথায় খুলি ফুটো করে রক্তনালীর স্ফীত অংশ কাটিয়া লওয়া বা রক্তনালীর ভিতরে কুন্ডলী করা বন্তু ঢুকিয়ে রক্তপাত বন্ধ করা সার্জারীর অন্তর্ভূক্ত।  যদি কোন রক্তনালীর স্ফীতি না পাওয়া যায় তবে চিকিত্সকগণ গভীরভাবে রোগীকে পর্যবেক্ষণ করবে এবং বার বার ইমেজিং (Imaging) করে দেখবে।

রোগী গভীরভাবে অচেতন হলে কিংবা তার সতর্কতা কমে গেলে তার চিকিত্সা করতে হবে। শরীরের বিশেষ অবস্থান, অন্তিম মুহুর্তে শ্বাস-প্রশ্বাসের কৃত্রিম সংযোজন এবং বিভিন্ন উপায়ে শ্বাসনালীকে রক্ষা করা ইত্যাদি সকলই এই চিকিত্সার অন্তর্গত। একটি নির্গমন নল মস্তিস্কের মধ্যে স্থাপন করতে হবে যাতে মস্তিস্কের ভিতর চাপ কমে। রোগী যদি সম্পূর্ণ সচেতন থাকে তবে তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। রোগীকে বলতে হবে এমন কোন কাজ করা যাবে না যাতে মস্তিস্কের চাপ বেড়ে যায়। সামনের দিকে ঝোঁকা, পায়খানা করার সময় চাপ দেওয়া এবং হঠাত্ শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করা ইত্যাদি মস্তিস্কের ভিতর চাপ বাড়ায়।

রোগীকে পায়খানা নরম করার জন্যে ওষুধ কিংবা রেচক জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে যাতে করে পায়খানা করার সময় কোন চাপ দিতে না হয়।  উক্ত রক্তচাপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনবোধে শিরার ভিতর দিয়ে ওষুধ দিতে হবে। সময়ে সময়ে ওষুধ সমন্বয় করতে হবে। ক্যালসিয়াম চ্যানেল বকার জাতীয় ওষুধ দিয়ে রক্তনালীর সংকোচনকে প্রতিরোধ করতে হবে। ব্যথা নাশক ও দুশ্চিন্তা নাশক ওষুধ দিয়ে মাথা ব্যথা এবং মস্তিস্কের ভিতরের চাপ কমাতে হবে। ফেনাইটয়িন বা অন্যান্য ওষুধ দিয়ে খিঁচুনির চিকিত্সা করতে হবে বা খিঁচুনিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণের একজন রোগী কতটুকু ভাল থাকবে তা নির্ভর করে কোথায় ও কি পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং কোন জটিলতা দেখা দিয়েছে কিনা। অধিক বয়স এবং মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিলে রোগীর ভবিষ্যত খারাপ। চিকিত্সা করলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ সম্ভব। তবে সব ধরণের চিকিত্সা করা সত্ত্বেও কোন কোন রোগী মারা যায়।

সম্ভাব্য জটিলতা

পুনর্বার রক্তক্ষরণ হল সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা। গুরু মস্তিস্কের রক্তনালীর স্ফীতি থেকে দ্ব্বিতীয়বার রক্তক্ষরণ হলে রোগীর ভবিষ্যত তাত্পর্যপূর্ণভাবে অধিকতর খারাপ। সাবঅ্যারকনয়েড রক্তক্ষরণ এর ফলে চেতনায় ও সতর্কতায় অবনতি ঘটতে পারে এমন কি রোগী সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে যেতে পারে কিংবা মারা যেতে পারে।

অন্যান্য জটিলতা

  • স্ট্রোক
  • খিঁচুনি
  • ওষুধের পার্শ প্রতিক্রিয়া
  • সার্জারীর জটিলতা

যদি কারও সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণের উপসর্গ দেখা দেয় তবে তাকে সরাসরি নিকটতম হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে নিয়ে যেতে হবে।

প্রতিরোধ

মস্তিসেড়র রক্তনালীর স্ফীতি চিহ্নিত করে সফলভাবে চিকিত্সা করতে পারলে সাবঅ্যারকনয়েড রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

লেখক: ডা:এম আমিনুল হক, সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন) , ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা