সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সব জ্বরেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়

কখনও জ্বরে ভোগেনি এমন লোক পাওয়া মুশকিল। তবে জ্বর কোনো অসুখ নয়, অসুখের লক্ষণ মাত্র। আবার গা গরম হওয়া মানেই কিন্তু জ্বর নয়। সংজ্ঞানুসারে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী মানদণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গিয়ে যদি শরীরের তাপমাত্রা ৩৬.৫ সেন্টিগ্রেড-৩৭.৫ সেন্টিগ্রেড (৯৮-১০০ ফারেনহাইট) থেকে বেড়ে যায় তবেই জ্বর বলে ধরে নেয়া হয়। সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা ৯৮.৪ বা ৯৮.৬ ফারেনহাইট থাকে। ১ ফারেনহাইট কম বা বেশিও হতে পারে। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ও তাপমাত্রা ১ ফারেনহাইট কমবেশি হতে পারে। এটা স্বাভাবিক।

তাপমাত্রা ১০০.৪ ফারেনহাইটের বেশি না হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই এবং একে স্বল্পমাত্রার জ্বর বা লো গ্রেড ফিভার বলে। জ্বরকে দেহের প্রোটেক্টিভ মেকানিজম বা প্রতিরক্ষাকারী প্রক্রিয়াও বলে। কারণ কিছু জীবাণু যেমন—ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রায় জীবনধারণ করতে পারে না। জ্বর কখনও একা আসে না, কখনও সঙ্গে আনে কাশি, গলা ব্যথা, দুর্বলতা, গা ব্যথা, কাঁপুনি, বমি ভাব ও খাবারে অরুচি ইত্যাদি।

একজন সুস্থ নারী বা পুরুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলো—
মুখে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯২-১০০ ফারেনহাইট। রেক্টাম বা পায়ুপথে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯৪-১০০ ফারেনহাইট। হাতের নিচে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯৬-৯৯ ফারেনহাইট।

বিভিন্ন ধরনের জ্বর
চলমান জ্বর : এক্ষেত্রে দিনব্যাপী জ্বর থাকে ও সারাদিনে তাপমাত্রার তারতম্য ১ ফারেনহাইটের বেশি হয় না। (জ্বরে ওষুধ খাওয়ালে অবশ্য কমবেশি হবে) এ ধরনের জ্বরের কারণ লোবার নিউমোনিয়াম টাইফয়েড, প্রস্রাবের ইনফেকশন ইত্যাদি।

নির্দিষ্ট বিরতির পর জ্বর : ক্ষেত্রে দিনে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর জ্বর আসে এবং মধ্যবর্তী সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। এ ধরনের জ্বরের কারণ ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, সেপটিসেমিয়া (রক্তে ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন) ইত্যাদি।

রেমিটেম্লট ফিভার : এক্ষেত্রে সারাদিনই জ্বর থাকে, তবে তামপাত্রার ওঠানামা ১ ফারেনহাইটের বেশি হয়। জ্বর কখনোই বেড়ে যায় না এবং তাপমাত্রাও একেবারে স্বাভাবিক হয় না। এ ধরনের জ্বরের কারণ ইনফেক্টিভ অ্যানডোকার্ডাইটিস বা হার্টের এক ধরনের ইনফ্লামেশন।

পল অ্যাবস্টেন ফিভার : এটি একটি বিশেষ ধরনের জ্বর, যেখানে এক সপ্তাহ অনেক জ্বর থাকার পর পরবর্তী সপ্তাহে জ্বর একেবারেই থাকে না। আবার পরের সপ্তাহে জ্বর আসে। এ ধরনের জ্বরের কারণ হজকিন্স লিম্ফোমা বা এক ধরনের ক্যান্সার।

প্যারাসিস্ট্যান্ট ফিভার বা ক্রমাগত জ্বর
ব্যাখ্যাতীত কারণে ক্রমাগত জ্বর, যা অজ্ঞাত কারণে শরীরের তাপমাত্রা বাড়া হিসেবে চিকিত্সকরা শনাক্ত করেন। তবে কখনও কখনও জ্বর ছাড়াও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। একে হাইপারথাইমিয়া বলে। যেমন—হিটস্ট্রোক হলে ও কিছু ওষুধ খেলে।

অতিরিক্ত জ্বর : তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের চেয়ে বেশি হলে এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, অতি দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী মারা যেতে পারে। এ ধরনের জ্বরের কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, সেপসিস, থাইরয়েড স্ট্র্রম, কাওয়াসাকি সিনড্রম ইত্যাদি।

জ্বরের কারণগুলো
ইনফেকশনের কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা, এনকেফালাইটিস, ম্যালেরিয়া, মেনিনজাইটিস, ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস।

ইনফ্লামেশনের কারণে ফোড়া, অ্যাবসেস হলে। টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে যেমন—অপারেশনের পর, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হিমোলাইটিক ডিজিজ বা রক্তকণিকা ভাঙার অসুখ, কেমোথেরাপি নিলে। রক্ত দেয়ার পর যদি দাতা ও গ্রহীতার এইচআইভি-এইডস থেকে বাঁচার জন্য দরকার রক্তের ক্রস ম্যাচিং বা সঠিক সমন্বয় না হয়। ক্যান্সার-লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ইত্যাদি হলে,
পালমোনারি এমবোলিজম হলে,
ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস হলে,
কখনও কিছু মেটাবোলিক অসুস্থতায় গাউট হলে।

জ্বর হলে কী হয়?
জ্বর শরীরের কোনো অসুবিধার জন্যই হয়। তবে এটি প্রতিরক্ষাকারী প্রক্রিয়া। কারণ জ্বর হলে উচ্চ তাপমাত্রায় রক্তের শ্বেতকণিকা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং শরীরে অনুপ্রবিষ্ট জীবাণু ধ্বংস করে। উচ্চ তাপমাত্রায় ফ্যাগোসাইটোসিস বা ক্ষতিকর জীবাণু খেয়ে ফেলার স্বাভাবিক দৈহিক প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। রোগ প্রতিরোধকারী টি সেলের বিস্তার বেড়ে যায়, যা দেহকে প্রতিরক্ষা দেয়। উচ্চ তাপমাত্রায় জীবাণু ও জীবাণু থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর পদার্থকে অকার্যকর করে।

জ্বর সম্পর্কে ভুল ধারণা
অনেকেই জ্বরের সময় কিছু খায় না। এতে শরীর দুর্বল হয়ে জীবাণুর বংশবিস্তার দ্রুততর হয়।
জ্বরের সময় অনেকে পানি ও জুস খান না এই মনে করে যে, এতে ঠাণ্ডা আরও বেড়ে যাবে, কিন্তু এটি ঠিক নয়। জ্বরের সময় প্রচুর পানি, ডাবের পানি ও ফলের রস খেতে হবে, যেমন— শরীর পানিশূন্যতার শিকার না হয়।

জ্বরের সময় অনেকে মাথায় পানি ঢালে। কিন্তু অতিরিক্ত পানি মাথায় ঢালার প্রয়োজন নেই। মাথা ধুলে দ্রুত শুকিয়ে ফেলুন। ভেজা চুল নিউমোনিয়া বা অন্যান্য ফুসফুসজনিত ইনফেকশনের কারণ হতে পারে।
ঠাণ্ডা বা বরফশীতল পানি দিয়ে অনেকে গা স্পঞ্জ করে। এটিও ঠিক নয়। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিয়ে গা স্পঞ্জ করে তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকিয়ে ফেলতে হবে।

অনেকে জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে চান না। কিন্তু জ্বর ১০২ ডিগ্রির বেশি হলে অবশ্যই জ্বরের ওষুধ খাওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশুদের। কারণ অন্যথায় তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ওঠে গেলে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খিঁচুনি হতে পারে।

জ্বর হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক?
কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসে পৌঁছার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিলে প্রকৃত রোগটি অনেক সময় ধরা পড়ে না ও সুচিকিত্সা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়।
জ্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবায়োটিক দিলে বাচ্চাদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার সুযোগও হয় না। তাই অন্তত দুই দিন না গেলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। মনে রাখবেন মেনিনজাইটিস বা সেপটিসেমিয়া ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দেরি করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে কোনো অসুবিধা নেই।

জ্বর যখন ভয়ের কারণ
জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি হলে, জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে, গায়ে লাল লাল ছোপ বা র্যাশ থাকলে, শরীরের অন্যান্য গ্ল্যান্ড বা লিম্ফনোড ফুলে গেলে শ্বাসকষ্ট ও কাশি থাকলে, মাথায় আঘাতের পর বমি, চোখে ঝাপসা দেখার পাশাপাশি জ্বর থাকলে, বারবার জ্বর এলে ও চিকিত্সায় ভালো না হলে, জ্বর ও গিঁটেব্যথা থাকলে জ্বর ভয়ের কারণ। এক্ষেত্রে তা বাতজ্বর হতে পারে। আবার জ্বর ও খুশখুশে কাশি তিন সপ্তাহের বেশি থাকলে এক্ষেত্রে যক্ষ্মাও হতে পারে।

মনে রাখবেন জ্বর বেশি মানেই রোগ বেশি এবং জ্বর কম মানে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই—এটা ঠিক নয়। কারণ অনেক সময় অনেক সাধারণ অসুখে অনেক জ্বর থাকে, আবার কোনো কোনো সময় মারাত্মক অসুখেও হালকা জ্বর থাকে।