সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

শ্বাসনালী ও ফুসফুসের টিউমার

শ্বাসনালী ও ফুসফুসের টিউমারবিশ্বব্যাপী ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম কারণ ফুসফুসের ক্যান্সার। ক্যান্সারে প্রতি বছর ১৪ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যায় ১৮ শতাংশ। ফুসফুসের ক্যান্সারে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৯ লাখ। বাকি প্রায় সাড়ে তিন লাখ (তিন লাখ ৩০ হাজার) মহিলা। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর শতকরা ৭০ ভাগই আক্রান্ত হওয়ার প্রথম বছরেই মারা যায়। ৬ শতাংশেরও কম পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। ১৯৫০ সালের পর ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুর হার আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে উন্নত বিশ্বের কোনো কোনো দেশে তামাক সেবন হ্রাস পাওয়ার ফলে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে ফুসফুসের ক্যান্সার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে কোনো কোনো স্থানে পুরুষের তুলনায় মহিলারাই ফুসফুসের ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। স্তন ক্যান্সারের চেয়ে ফুসফুসের ক্যান্সারে মেয়েদের মৃত্যুর হার বেশি। ধারণা করা হয় আগামী ১০ বছরে ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুর হার আরো বৃদ্ধি পাবে। ক্যান্সারে আক্রান্ত পুরুষ ও নারীর হার ৪:১। উল্লেখ্য, ফুসফুসে যত টিউমার হয় তার ৯০ শতাংশের বেশি থাকে শ্বাসনালীতে এবং শ্বাসনালীতে অবস্থিত এসব টিউমারের ৯০ শতাংশই ক্যান্সার।

তামাক সেবন ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্যান্সারের অন্যতম মৌল কারণ। তবে তামাক সেবন ছাড়াও অন্যান্য কারণেও ক্যান্সার হতে পারে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বংশগত কারণ, শিল্পায়নজনিত দূষণ, জলবায়ূ দূষণ, গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, খাদ্যে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়া, পেশাগত ঝুঁকি যেমন- সিলিকন, এজবেস্টস প্রভৃতি ধাতব শিল্পে কাজ করা ইত্যাদি।

অনেক সময় অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের ফলেও ক্যান্সার হতে পারে। শ্বাসনালী ও ফুসফুস ছাড়াও শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন- স্তন, কিডনি, জরায়ু, ওভারি, অণ্ডকোষ, থাইরয়েড, যৌনাঙ্গ, হাড়, পায়ুপথ, অন্ত্র, যকৃত, মস্তিষ্কসহ নানা স্থানে ক্যান্সার হতে পারে।

শ্বাসনালীর ক্যান্সারে কোষভিত্তিক বিভাজন নি¤œরূপ :
১. স্কোয়ামাস সেল ক্যান্সার-শতকরা ৩৫ ভাগ।
২. এডিনোকারসিনোমা-শতকরা ৩০ ভাগ।
৩. ুদ্র কোষ (স্মল সেল) ক্যান্সার-শতকরা ২০ ভাগ।
৪. বৃহৎ কোষ (লার্জ সেল) ক্যান্সার-শতকরা ১৫ ভাগ।

এদের মধ্যে ুদ্র কোষের ক্যান্সারই মারাত্মক। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন- স্তন, কিডনি, জরায়ু, ওভারি, অণ্ডকোষ, থাইরয়েড ও হাড়ের সারকোমার প্রাথমিক ক্যান্সারও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শ্বাসনালীর টিউমারের কারণে শ্বাসনালী অবরুদ্ধ হতে পারে। ফুসফুসের ক্যান্সার ফুসফুসের কেন্দ্র, আশপাশের এলাকা অথবা ফুসফুসের স্থানে স্থানে হতে পারে।

ফুসফুস ক্যান্সারের লক্ষণ
ক. সাধারণ লক্ষণ : জ্বর, ুধা মন্দা, বমি বমি ভাব, ওজন হ্রাস, দুর্বলতা ও কান্তি বোধ।
খ. স্থানীয় লক্ষণ : ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক সাধারণ লক্ষণ কাশি। অণু জীবাণুর সংস্পর্শে এলে কাশি হলুদ হয়। ধূমপায়ীরা সাধারণত যে ঢংয়ে কাশি দেয় তার থেকে কারো কাশির ঢং আলাদা মনে হলে সেটাকে ফুসফুসের ক্যান্সার বলে সন্দেহ করা যায়।

ধূমপায়ীদের কাশির সাথে রক্তক্ষরণ হলে ফুসফুসের ক্যান্সার বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বক্ষ আবরণীতে বেশি করে পানি জমলে অথবা বড় আকারের টিউমারের কারণে শ্বাস কষ্ট হলেও ফুসফুসের ক্যান্সার বলে সন্দেহ করা যায়। টিউমারজনিত কারণে সঙ্কুচিত শ্বাসনালী থেকে খসখসে আওয়াজ বের হলে ক্যান্সার বলে সন্দেহ করা যেতে পারে।

ফুসফুসের ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়লে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো : বক্ষ আবরণীতে ব্যথা, ঘাড় ও বাহুতে ব্যথা, জন্ডিস (যকৃত আক্রান্ত হলে), হাড়ে ব্যথা (হাড় আক্রান্ত হলে)। ঘাড়ের ওপরিভাগে অবস্থিত নার্ভগ্রন্থি আক্রান্ত হলে চোখের সমস্যা হতে পারে। বাম দিকে অবস্থিত বাকযন্ত্রের স্নায়ুতে চাপের কারণে কণ্ঠস্বর ভারী হতে পারে। বুকে অবস্থিত সুপিরিয়র ভ্যানাক্যাভা নামক শিরায় রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে শরীরের ওপরিভাগ ফুলে যায়। খাদ্যনালী আক্রান্ত হওয়ার কারণে খাওয়ার সময় খাদ্যনালীতে ব্যথা অনুভূত হয়। ফুসফুসের ক্যান্সার মস্তিষ্ক কোষে ছড়িয়ে পড়লে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এর প্রতিফলন ঘটতে পারে। মেযন- হাত ও পা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া ইত্যাদি।

ফুসফুসের ক্যান্সার শরীরের যেকোনো স্থানে কেন্দ্রীভূত হলে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো

ক. এন্ডোক্রিন বা শরীরে রসবাহী বিভিন্ন গ্রন্থির প্রতিক্রিয়া : ক্যান্সারের বিষক্রিয়ার ফলে এডিএইচ নামক হরমোন কমে যাওয়ার কারণে রক্তের সোডিয়াম কমে যায়। এসিটিএইচ নামক হরমোন নিঃসরণের ফলে পুশিং সিনড্রম বা মুখের আকার চাঁদের মতো গোল হয়ে যায়। রক্তের ক্যালসিয়াম বৃদ্ধি পায়। ক্যান্সারজনিত লক্ষণাদি (কারসিনয়েড সিনড্রম) দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পুরুষের স্তন বড় হয়ে যায়।

খ. স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া : স্নায়ুঘটিত বিভিন্ন অসুখ যেমন- হাত ও পা অবশ অবশ লাগা, আঙুলের মধ্যে পির পির করা ইত্যাদি। মাংসপেশির দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা ইত্যাদি। মস্তিষ্কের সেরিবেরাল নামক অংশের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। সর্বশরীরের পেশি দুর্বল হয়ে পড়া।

গ. অন্যান্য প্রতিক্রিয়া : হাত ও পায়ের আঙুলের মাথা ফুলে ড্রাম স্টিকের (ঢাকের কাঠি) মতো হতে পারে। কিডনি জড়িত হলে সারা শরীর ফুলে যেতে পারে, চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে। ইসনোফিল নামক রক্তের উপাদান বৃদ্ধি পেতে পারে।

চিহ্নগুলো (সাইনস)
ক. প্রান্তিক চিহ্ন : রক্ত স্বল্পতা, ওজন হ্রাস, আঙুলের মাথা ফুলে যাওয়া এবং গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া ছাড়াও চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সুপিরিয়র ভ্যানাক্যাভা (হার্টের ওপরের দিকে অবস্থিত ভ্যানাক্যাভা নামক ধমনী) বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে শরীরের ওপরিভাগ থেকে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার ফলে শরীরের ওপরিভাগ ফুলে যাওয়া।

খ. ফুসফুসের চিহ্ন : টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফুসফুসে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। বক্ষ আবরণীতে পানি জমা। টিউমার পাঁজরের দিকে ছড়িয়ে পড়লে পাঁজরে তীব্র ব্যথা হয়। এ ছাড়া টিউমার ফুসফুসের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লে ফুসফুসের নানাবিধ পরিবর্তন ঘটতে পারে।

ফুসফুসের টিউমার সন্দেহ হলে নি¤œলিখিত পরীক্ষাগুলো করা যেতে পারে যেমন- বুকের এক্স-রে, রুটিন রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি), বায়োপসির মাধ্যমে ফুসফুসের কোষ পরীক্ষা করে দেখা, কাশি পরীক্ষা ও ব্রঙ্কোস্কোপি করা। বক্ষ আবরণীতে পানি জমলে বুকের পানি পরীক্ষা করা। গ্ল্যান্ড স্ফীত হলে তা পরীক্ষা করে দেখা। ফুসফুসের আবরণীর বায়োপসি করা। সিটি গাইডেড বায়োপসি করা। এ ছাড়া লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রাম, হাড়ের স্ক্যানিং, বেরিয়াম এক্স-রে করা যেতে পারে।

ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসা
ক. উপসর্গের চিকিৎসা : ব্যথার জন্য ব্যথার ওষুধ, রক্ত কমে গেলে রক্ত দেয়া, পুষ্টি ঘাটতি হলে পূরণ করার ব্যবস্থা করা।
খ. অন্যান্য চিকিৎসা : রেডিও থেরাপি, কেমোথেরাপি বা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা, লেজার পদ্ধতিতে চিকিৎসা ও শৈল্য চিকিৎসা। স্কোয়ামাস কোষে কেন্দ্রীভূত ক্যান্সার শৈল্য চিকিৎসায় নিরাময় হতে পারে।

লেখক : ডা: এ কে এম আহসান আলী,  যক্ষ্মা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ. চেম্বার : ৬৫/ডি, জিগাতলা, ঢাকা-১২০৯