সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

শীতে সুস্থ থাকুন

আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন ধরনের স্বাস’্য সমস্যা দেখা যায়। পরিবেশের তাপমাত্রা কম, আর্দ্রতা বেশি, ধুলোবালু, ধোঁয়া, সুগন্ধি, ফুলের রেণু, তীব্র গন্ধ, মোল্ড ইত্যাদির কারণে শীতে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা ত্বক ও শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগে থাকেন।

বছরের এ সময় কী কী রোগবালাই হয় এবং এ থেকে মুক্তির করণীয় দিক সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো :

শীতে কিভাবে ত্বক পরিচর্যা করবেন: এ সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা কম থাকায় ত্বক থেকে বায়ু পানি শুষে নেয়। আমাদের দেহের বেশির ভাগই হলো পানি এবং এর মধ্যে ত্বক নিজে ধারণ করে ১৫ শতাংশ। ফলে ত্বক থেকে পানি বেরিয়ে গেলে ত্বক হয়ে ওঠে শুষ্ক ও দুর্বল। ত্বকের যেসব গ্রনি’ থেকে তেল ও পানি বের হতো তা আগের মতো এর কোনোটাই তৈরি করতে পারে না।

ত্বকে এ সময় তেলের প্রলেপ দিতে হবে। যেমন- অলিভ অয়েল। শুষ্ক ত্বকের জন্য উপকারী হলো ময়েশ্চারাইজার। এটি আসলে তেল ও পানির একটি মিশ্রণ। ত্বক কোমলকারী কিছু পদার্থ এতে থাকে যেমন- পেট্রোলিয়াম, ভেজিটেবল অয়েল, ল্যানোলিন, সিলিকন, লিকুইড প্যারাফিন, গ্লিসারিন ইত্যাদি। মুখে ভালো কোনো কোল্ডক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিভাবে গ্লিসারিন ব্যবহার করবেন : গোসল থেকে বেরিয়ে প্রথমে টাওয়েল দিয়ে চেপে শরীরের পানিটুকু তুলে নিতে হবে। এরপর পানি ও গ্লিসারিনের মিশ্রণ শরীরে মাখতে হবে। তবে ত্বকের ভাঁজে গ্লিসারিন বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক ভেজা থাকে এবং এখানে ফাঙ্গাসের জন্ম নেয়। ময়েশ্চারাইজার সুগন্ধিযুক্ত না হওয়াই ভালো। কারণ তাতে ত্বকে অ্যালার্জি হতে পারে।

তেল কখন মাখবেন : তেল অবশ্যই শীতকালে গোসলের পরে মাখতে হবে। এ সময় তেল না দিলে ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে।

ঠোঁট ও পা ফাটলে কী করবেন : ঠোঁটে ভ্যাসলিন, লিপজেল বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা উচিত। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানো কখনোই উচিত নয়। এতে ঠোঁট ফাটা আরো বেড়ে যেতে পারে। পা ফাটলে এক্রোফ্লাভিন দ্রবণে পা দুটো কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে তারপর তুলে নিতে হয়। পা শুকিয়ে যাওয়া মাত্র ভ্যাসলিন মেখে নিন। এ সময় পায়ে হাঁটা অবশ্যই বন্ধ রাখতে হবে।

শীতে ত্বকের আরেকটি যে রোগ বাড়ে তাকে ইকথায়োসিস ভালগ্যারিস বলে। এটি একটি জন্মগত রোগ। আক্রান্তের পিতামাতার অ্যালার্জিজনিত রোগ যেমন এটোপিক ডার্মাটাইটিস, হাঁপানি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা থাকে বলেই পরবর্তী প্রজন্ম এ রোগে ভুগতে পারে। এদের ত্বক থাকে শুষ্ক, ফাটা ফাটা এবং গুঁড়ি গুঁড়ি আঁশ উঠতে থাকে। হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, বাহু এবং দেহের পেছনের অংশে ত্বকের এ সমস্যা হয়। আলফা হাইড্রক্সি অ্যাসিড ব্যবহারে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। গ্লিসারিনের সাথে পানি মিশিয়েও ব্যবহার করা যায়।

নাক, কান ও গলার সমস্যা : ঘন ঘন সর্দি-কাশি হওয়া, নাকে অ্যালার্জি ও ইনফেকশন, কাশি এ সময়ে শ্বাসতন্ত্রের অন্যতম সমস্যা। নাকের অ্যালার্জি থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস রোগ হয়ে থাকে। এসব রোগীর নাক বন্ধ থাকে, নাক দিয়ে সর্দি ঝরে এবং হাঁচি অনেক বেশি হয়। এটি তীব্র আকার ধারণ করলে রোগী নাকে কোনো গন্ধ পান না এবং মাথা ভার ভার থাকে। এসব সমস্যার কারণে জ্বর জ্বর ভাব থাকা বা প্রচণ্ড জ্বর থাকাও অস্বাভাবিক নয়। শীতে শিশুদের টনসিল ও এডিনয়েডের সমস্যা থাকলে তা বেড়ে যায়। এ থেকে গলা ব্যথা, জ্বর ও ঢোক গিলতে অসুবিধা হয়ে থাকে।

যাদের এ সমস্যা হয় তাদের প্রথমেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। ধুলোবালু, ঠাণ্ডা পরিহার করতে হয়। নাকের সমস্যা সমাধানের জন্য নাকে স্টেরয়েড সেপ্র ব্যবহার করা যেতে পারে। ইনফেকশন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, যাদের নাকের হাড় বাঁকা আছে; তারা দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস ও নাকের অ্যালার্জি রোগে ভুগে থাকেন। স্বাভাবিক চিকিৎসায় এর নিরাময় না হলে শিশুদের ক্ষেত্রে ছয়-সাত বছর পর নাকের হাড় সোজা করার অপারেশন সেপ্টোপ্লাস্টি করিয়ে নিতে হবে।

টনসিলে ইনফেকশন থাকলে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। সাথে জ্বর ও ব্যথা থাকলে প্যারাসিটামল গ্রুপের ওষুধ খেতে হয়। এ ক্ষেত্রে শিশুরা লবণ-গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করতে পারে। ছোটদের গলা ব্যথাকে কখনোই অবহেলা করবেন না। শীতে শিশুদের কানে ইনফেকশন বা ব্যথা অতিপরিচিত একটি সমস্যা। চিকিৎসা না নিলে কানে পুঁজ গড়িয়ে পড়ে সমস্যা আরো প্রকট হয়। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জন্য এমনটি হয়। কানে পানি জমে গেলে বা গ্লু-ইয়ার হলে শিশু কানে কম শোনে, খিটখিটে মেজাজের ও অমনোযোগী হয়- এ ক্ষেত্রে অতি সত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

খুসখুসে কাশি অনেক সময় হাঁপানির পূর্বাবস’া নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে সালবিউটামল ইনহেলার ব্যবহার করা যেতে পারে।

শিশুদের রোগবালাই : শিশুরা শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণেই বেশি ভোগে। যেমন- সর্দি, কাশি, হালকা জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি। শ্বসনতন্ত্রের নিম্নভাগে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের যে সমস্যা হয় তা হলো এলভিওলাইটিস। এ রোগ দুই বছর পর্যন্ত চলতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না নিলে জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া শিশুদের চামড়ায় স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া এবং রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া হয়ে থাকে। এ ডায়রিয়া ইনফেকটেড হলে সিগেলোসিস নামক ডিসেন্ট্রি হয়ে থাকে।
সাধারণত সর্দি, কাশি, জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ও অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খেতে দিতে হয়।

এ সময়ে শিশুকে প্রচুর তরল যেমন- দুধ ও জুস খাওয়াতে হবে। শিশুর বুকে সরাসরি যেন বাতাস না লাগে, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কার্ডিগান সোয়েটার, মাথায় টুপি, মোজা ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় শিশু যেন সব সময় একই তাপমাত্রায় থাকে। শিশুর বুকে ইনফেকশন, সর্দি, জ্বর প্রতিরোধের জন্য হামের টিকা খুব কার্যকর। এ ছাড়া হুপিংকফ ও ডিপথেরিয়ার টিকা এবং নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস প্রতিরোধের ভ্যাক্সিন দেয়া উচিত। অনেকে মনে করেন ভিটামিন এ ও সি এসব রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। শিশুর যেসব খাদ্যে অ্যালার্জি আছে তা খাওয়ানো পরিহার করতে হবে।

লেখিকা : ডা: ওয়ানাইজা, সহকারী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।