সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

শিশুর মাথাব্যথা সমস্যা

শিশুর মাথাব্যথা সমস্যাশিশুরা যখন মাথাব্যথার অভিযোগ করে, অনেক মা-বাবা মনে করেন মাথাব্যথার অভিযোগটা সত্যি নয়, শিশু ভান করছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশেরই মাথাব্যথার অভিজ্ঞতা হয়।

শিশুদের মাথাব্যথার কারণগুলো বড়দের মাথাব্যথার কারণগুলোর মতো অনেকটা একই রকম। তাদের চাপজনিত মাথাব্যথা হয়; মাথাব্যথার সাথে আঘাত, অসুস্থতা কিংবা জ্বরের সম্পৃক্ততা থাকে; আর মাইগ্রেন বা আধকপালে মাথাব্যথা হয়। মাথাব্যথায় আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ শিশুর দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেন হয়।

বড়দের মাথাব্যথার চিকিৎসায় যেসব ওষুধ বিশেষ করে ব্যথানাশক ব্যবহার করা হয়, শিশুদের মাথাব্যথার ক্ষেত্রেও সাধারণত একই ওষুধ ব্যবহার করা হয় ও মাঝে মধ্যে মাথাব্যথা হলে একই রকম গরম সেক দেয়া হয়। মাথাব্যথার চিকিৎসাকে আরো ফলপ্রসূ করার জন্য এখানে কিছু পরামর্শ দেয়া হলো, যা অনুসরণ করলে শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।

তবে এসব ঘরোয়া চিকিৎসা শুরু করার আগে শিশুকে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন তার মাথাব্যথা এটা মারাত্মক কোনো রোগের উপসর্গ কি না।

শিশুর মাথাব্যথা সমস্যাপ্রমাণিত ব্যথানাশক দিন
শিশুদের মাথাব্যথার জন্য সাধারণ ব্যথানাশক যেমন অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামিল যথারীতি সন্তোষজনক ও কার্যকর ওষুধ। শিশুকে খালি পেটে এটা দেবেন না। আগে হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে তারপর ওষুধ খাওয়াবেন। প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্দেশনা অনুযায়ী শিশু বয়স ও ওজন অনুপাত শিশুকে সঠিক মাত্রায় ওষুধটি দেবেন।

আরামদায়ক সেক দিন
কিছু কিছু শিশু তাদের মাথায় গরম সেক দিতে পছন্দ করে, আবার কিছু শিশু পছন্দ করে ঠাণ্ডা সেক। আপনি পরীক্ষা করে দেখুন আপনার শিশুকে কোন ধরনের সেক দিলে সে আরাম বোধ করে। সেক দেয়ার জন্য কাপড়ের পুঁটলি বা প্যাড প্রায় ৩০ মিনিট রেখে দেবেন, প্রয়োজনে এটা আবার ভিজিয়ে নেবেন।

শিশুকে বিশ্রামে রাখুন
মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে সবচেয়ে কার্যকর একটি উপায় হলো বিশ্রাম নেয়া। শিশুর মাথাব্যথা হলে তাকে আধঘণ্টা শুইয়ে রাখলে ব্যথা অনেক কমে যায়। ঘুম পড়ানোটা এ সময়ে এতটা অপরিহার্য নয়। স্রেফ আধঘণ্টা শান্ত হয়ে শুয়ে থাকলেই উপকার পাওয়া যেতে পারে। যদি মাইগ্রেনের আক্রমণের সময় আপনার শিশু উজ্জ্বল আলো সহ্য করতে না পারে, তাহলে আলো নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে তাকে বিশ্রাম নিতে দেবেন।

ম্যাসাজ করুন
চাপ কমানোর মাধ্যমে বড়দের মতো ছোটদেরও চাপজনিত মাথাব্যথা নিরসন করা যেতে পারে। যদি আপনার শিশুর চাপ বেশি থাকে, তাহলে ম্যাসাজ করে দিলে উপকার পেতে পারেন। যদি শিশুর মাথা বা কপালের দুই পাশের পেশি ব্যথা করে তাহলে ধীরে ধীরে এসব জায়গা মালিশ করুন, কিছুক্ষণ পর ব্যথা কমে যাবে। কিন্তু কিছু কিছু শিশু এটা পছন্দ করে না, কারণ তাদের মাথা স্পর্শ করলে খুব ব্যথা পায়। যদি আপনার শিশু আপনাকে থামতে বলে তাহলে আর ম্যাসাজ করবেন নাÑ অবশ্য অনেক শিশু মা-বাবার আঙুলের স্পর্শে আরাম বোধ করে।

শিশুকে না খাইয়ে রাখবেন না
খেয়াল রাখবেন আপনার শিশুর খাওয়া, বিশেষ করে সকালের নাশতা যেন বাদ না পড়ে। মাথাব্যথার ক্ষেত্রে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি আপনার শিশু সারা দিন না খেয়ে থাকে তাহলে তার মাথাব্যথা হবে আর যদি আগেই মাথাব্যথা হয়ে থাকে এবং সে না খেয়ে থাকে তাহলে তার মাথাব্যথা আরো বেড়ে যাবে।

মাথাব্যথা উদ্রেককারী খাবার পরিহার করুন
আপনার শিশু কী কী খাবার খাচ্ছে এবং সেই সব খাবার গ্রহণের পর তার মাথাব্যথা করছে কি না সেটা সতর্কতার সাথে খেয়াল করুন, যদি সে রকম কিছু আপনার নজরে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে ওই খাবারের সাথে আপনার শিশুর মাথাব্যথার সম্পর্ক রয়েছে।

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ খাবার মাথাব্যথার উদ্রেক করে। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে চকোলেট, চিনা বাদাম, প্রক্রিয়াজাত গোশত ও পুরনো পনির। পিৎজা ও চায়নিজ খাবারের মধ্যে যদি মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট থাকে তাহলে সেসব খাবার কিছু কিছু শিশুর মাথাব্যথা ঘটাতে পারে। যদি আপনার শিশুর মাথাব্যথার জন্য কোনো খাবারকে আপনি সন্দেহ করেন তাহলে সেই খাবারটি বন্ধ করে দিয়ে দেখুন শিশুর মাথাব্যথার কোনো উন্নতি হচ্ছে কি না।

ক্যাফিন নিয়ন্ত্রণ করুন
শিশুকে যদি প্রতিদিন সকালে কফি পান করানোর অভ্যাস সৃষ্টি করেন তাহলে কোনো এক সকালে তার কফি গ্রহণ বাদ পড়লে অর্থাৎ তার শরীর নির্দিষ্ট ক্যাফিন না পেলে মাথাব্যথা হতে পারে। শিশুদের মধ্যে ক্যাফিন প্রত্যাহারজনিত মাথাব্যথার পরিমাণ খুব বেশি। যেসব শিশু কোলা পান করে এবং প্রচুর পরিমাণ চকোলেট খায় তারা এ সমস্যায় বেশি পড়ে। কোলা ও চকোলেট দুটোতেই ক্যাফিন রয়েছে। শিশুকে এসব খাবার থেকে বিরত রাখুন। যেহেতু শিশুর এসব খাবারের প্রতি বেশ লোভ থাকে, তাই কেবল মাঝে মধ্যে তাকে এ খাবার দিতে পারেন, কিন্তু খুবই সামান্য দেবেন।

মেজাজের পরিবর্তন লক্ষ করুন
কিছু কিছু শিশুর মাথাব্যথা খাবারজনিত কারণের চেয়ে আবেগজনিত কারণে বেশি বেড়ে যায়। আপনি শুধু শিশুর মাথাব্যথার রেখাচিত্র সৃষ্টি করলেই হবে না, কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহে তার মেজাজ ও ক্রিয়াকলাপ লিপিবদ্ধ করে রাখবেন। আপনি মাঝে মধ্যে তার মাথাব্যথার সাথে মেজাজের ধরনটা মিলিয়ে দেখবেন। উদাহরণস্বরূপ স্কুলে পরীক্ষার ঠিক আগে কিংবা বাড়িতে কারো সাথে ঝগড়ার পরে তার মাথাব্যথা হতে পারে। মেজাজের পরিবর্তনের সাথে শিশুর মাথাব্যথার সূত্রপাতটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি চেষ্টা করবেন শিশুর মেজাজটাকে শান্তপর্যায়ে রাখতে।

মানসিক চাপ কমানোর পরিকল্পনা করুন
যদি আপনার শিশুর মাথাব্যথা আবেগজনিত কারণে হয়ে থাকে তাহলে সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাকে একটা পরিকল্পনা দিয়ে সাহায্য করুন। সে যদি বর্তমান অবস্থাটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারে তাহলে সে অনেক ভালোবোধ করবে।

উদাহরণস্বরূপ যদি আপনার শিশু তার বোনের সাথে ঝগড়া করার পর মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয় তাহলে আপনার শিশুকে একটা পরামর্শ দিন পরে সে কিভাবে তার বোনের সাথে একত্রে খেলাধুলা করবে। তার বোনকে সে কী বলবে আপনি তাকে শিখিয়ে দিন, প্রয়োজনে সে যেন কয়েকবার আপনার সামনে মহড়া দেয়। যেমন : সে তার বোনকে বলতে পারে ‘যখন তুমি আমার সাথে এ রকম ব্যবহার করো, আমার ভালো লাগে না। তাই আমি আর তোমার সাথে খেলব না যতক্ষণ না তুমি দুঃখ প্রকাশ করছ।’ কার্য পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সেটা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং এর ফলে মাথাব্যথাও কমে যায়।

সব কারণ খুঁজে দেখুন
যদি কয়েক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, আপনার শিশুর মাথাব্যথার সাথে খাবার বা আবেগজনিত বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই তাহলে আপনার অনুসন্ধানের ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত করুন। আপনি খুঁজে দেখুন আবহাওয়ার সাথে আপনার শিশুর মাথাব্যথার সম্পর্ক রয়েছে কি না, দেখুন মাথাব্যথার আগে আপনার শিশু রাতে কতটা ঘুমিয়েছে প্রতিটা সম্ভাব্য কারণের কথা ভেবে দেখুন।

কোনো কোনো শিশুর সূর্যালোকে মাথাব্যথা হতে পারে, এমনকি পুকুর পাড়ে বসলেও সূর্যালোক পানিতে প্রতিফলিত হয়ে মাথাব্যথা ঘটাতে পারে। কী কারণে আপনার শিশুর মাথাব্যথা হচ্ছে সব কিছুর রেকর্ড রাখুন যাতে চিকিৎসককে ভালো করে অবহিত করতে পারেন।

মজা করার জন্য কিছু সময় বরাদ্দ রাখুন
যেসব শিশুর বারবার মাথাব্যথা হয়, সত্যিকার অর্থে তাদের বিনোদনের অভাব রয়েছে। তাদের জন্য কিছুটা বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে ওই সময়টাতে তারা আনন্দ-উল্লাস করতে পারে। অনেক কিছু পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কাজের সাথে জড়িত থাকে। ফলে তাদের বিশ্রামও কম হয়। তাদের কিছু কার্যক্রম কমিয়ে দিতে হবে, যাতে তারা কিছুটা সময় পায় বিশ্রাম ও মজা করার জন্য। আর শিশুকে কোনো ভারী ও চিন্তাশীল কাজের সাথে সম্পৃক্ত করবেন না।

মাংসপেশিকে নড়াচড়া করতে দিন
ঘন ঘন মানসিক চাপের ফলস্বরূপ মাংসপেশির চাপজনিত মাথাব্যথা হয়। তবে শুধু শারীরিক কারণেও কখনো কখনো মাথাব্যথা হতে পারে। যেমন, আপনার শিশু যদি প্রচুর ভিডিও গেম খেলে কিংবা কম্পিউটারে কাজ করে তাহলে তার মাথাটা এক অবস্থানে দীর্ঘ সময় ধরে রাখার জন্য মাথাব্যথা হতে পারে। তাই মাঝে মধ্যে তার মাথাটা ঘোরাতে বলবেন কিংবা ঘন ঘন তাকে ওই সব কাজে বিরতি দিতে বলবেন। মাংসপেশি নড়াচড়া করার সুযোগ পেলে মাথাব্যথার আক্রমণ কম হবে।

শিশুকে শরীর-মন শিথিল করার কৌশল শেখান
যদিও পেশাদাররা বেশ কিছু রিল্যাক্সেশন বা শরীর-মন শিথিল করার কৌশল প্রয়োগ করে তাদের রোগীদের মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করেন, তবে মা-বাবা তাদের শিশুকে এ ধরনের কিছু কৌশল শিখিয়ে দিলে মাথাব্যথায় সেগুলো বেশ উপকারে আসবে। যেমন : আপনি এভাবে আপনার শিশুকে শরীর-মন শিথিল করার কৌশল শেখাতে পারেন আপনার শিশুকে চোখ বুঝে কল্পনা করতে বলুন সে গরম পানিতে গোসল করছে আর তার সারা শরীরে পানির মৃদু আঘাতে শরীর শিথিল হয়ে পড়ছে। অথবা তাকে একটা ছবি কল্পনা করতে বলুন, সে নদীর কিনারা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে… নদীর পানি ধীরে ধীরে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার পায়ের আঙুল, পায়ের পাতা, তার গোড়ালি, হাঁটু… ধীরে ধীরে সব শরীর। এসব প্রক্রিয়া শিশুর শরীরের মাংসপেশিগুলো খুব দ্রুত শিথিল হয়ে পড়বে এবং শিশু আরামবোধ করবে। যদি আপনার শিশু নিজে শিথিল করার পদ্ধতি শিখতে চায় আপনি নিজে তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করুন।

খ্যাচ খ্যাচ না করে সমর্থন দিন
শিশুর দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা থাকলে তার নিয়মিত শিথিলকরণ পদ্ধতি অনুশীলন করা প্রয়োজন, কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলোÑ অনেক শিশুর কাছে এগুলো বারবার অনুশীলন করা একঘেয়েমি কাজ বলে মনে হয়। কিন্তু যদি আপনি এ নিয়ে খ্যাচ খ্যাচ করেন তাহলে তা শিশুর আরো বেশি মানসিক চাপের সৃষ্টি করবে। আপনি বরং শিশুর ওপর খ্যাচ খ্যাচ না করে তাকে সমর্থন দিন।

শিশুর অনুশীলনের জন্য জায়গা ও সময় বাড়িয়ে তাকে নিজের মতো করে অনুশীলন করতে বলুন। যদি আপনি শিশুর মধ্যে প্রাথমিক দায়িত্ববোধের জন্ম দিতে পারেন তাহলে সে সফল হবে।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
যদিও এটা বিরল ঘটনা, তবু মাঝে মধ্যে কিছু মারাত্মক সমস্যার উপসর্গ হিসেবে মাথাব্যথা হতে পারে। যেমন : মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্কে টিউমার কিংবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। যদি আপনার শিশুর মাথাব্যথা থাকে এবং সেই সাথে নিচের বিষয়গুলোর সংযোগ থাকে তা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

  • যদি আপনার শিশুর মাথাব্যথার সাথে জ্বর, বমি, ঘাড় শক্ত হওয়া, আলস্য বা তন্দ্রা কিংবা দ্বিধাগ্রস্তভাবে থাকে।
  • যদি মাথায় আঘাত পাওয়ার পরে মাথাব্যথা হয়।
  • যদি মাথাব্যথা সকালের দিকে হয় এবং সেই সাথে বমি বমিভাব থাকে।
  • যদি সারা দিন মাথাব্যথা বাড়তেই থাকে কিংবা পরের দিনে মাথাব্যথা আরো বেশি হয়।
  • যদি হাঁচি বা কাশির ফলে হঠাৎ করে মাথাব্যথা হয়।
  • যদি মাথাব্যথার কারণে শিশুর স্কুল বা অন্যান্য কাজ ব্যাহত হয়।
  • যদি মাথার একপাশেই কেবল ব্যথা সীমিত থাকে।

লেখক : হাড়-জোড়া, বাত-ব্যথা ও আঘাতজনিত রোগবিশেষজ্ঞ ও সার্জন। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।  ল্যাব সাইন্স ডায়াগনস্টিক লিমিটেড, ১৫৩/১ গ্রিন রোড (পান্থপথের কাছে), ঢাকা।