সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

শিশুর ডায়াবেটিস ও তার খাবার

দিন যত যাচ্ছে, ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিগত বছরগুলোর চেয়ে শিশুর ডায়াবেটিসের হার বর্তমান সময় অনেক বেশি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিশুই অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগে, যে কারণে আমাদের দেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিসে শিশুরাই বেশি ভোগে।

ডায়াবেটিস হলো ইনসুলিনের সমস্যাজনিত রোগ। ইনসুলিনের উৎপাদন কম বা অকার্যকর হলে দেহের অধিকাংশ কোষে গ্লুকোজের অভাব ও রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই সামগ্রিক অবস্থাই হচ্ছে ডায়াবেটিস।

শিশুর ডায়াবেটিস হওয়ার আগে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, তা হলো ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। পানির পিপাসা লাগা। সব সময় ক্লান্তিবোধ করা, বারবার ক্ষুধা পাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা প্রভৃতি। ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। শিশুর ডায়াবেটিস হলে মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন হতাশায় না ভুগে কীভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা জানা প্রয়োজন। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য ৩ডি+২ই সূত্রটি শিশুকে শেখাতে হবে।

ডি১ = ডায়েট, অর্থাৎ সঠিক সময়ে পরিমাণমতো খাবার খাওয়া। ডি২ = ডিসিপ্লিন, জীবনের সব ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খভাবে জীবনযাপন করা। ডি৩ = ড্রাগস, প্রতিদিন ঠিক সময়ে ইনসুলিন নেওয়া। ই১ = এক্সারসাইজ, শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা। ই২ = এডুকেশন, কীভাবে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা জানা।
অনেক মা-বাবা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুকে কম করে খাবার খাওয়ান—এ অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। জন্মের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর খাবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু অন্য যেকোনো শিশুর মতো একই খাবার খেতে পারে, তবে মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার, যেমন—চকলেট, কেক, জুস, কোমল পানীয়, আখের রস, খেজুরের রস, গুড়ের শরবত প্রভৃতি খাওয়া নিষেধ। কারণ, এ খাবারগুলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়।

আমরা প্রতিদিন খাবার থেকে যে শক্তি পাই, তার বেশির ভাগই আসে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার থেকে। শর্করা দেহে জ্বালানিরূপে কাজ করে। বয়স, দেহের ওজন, উচ্চতা ও পরিশ্রমের ওপর শর্করার চাহিদা নির্ভর করে। ভাত, রুটি, আলু, সুজি প্রভৃতি শর্করাজাতীয় খাবার শিশুকে পরিমাণমতো খাওয়াতে হবে।

শিশুর দেহে প্রোটিন বা আমিষের প্রধান কাজ হচ্ছে শরীরের বৃদ্ধিসাধন, গঠন, পরিশোষণ ও ক্ষয়পূরণ। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে প্রাণিজ প্রোটিন, যেমন—মাছ, মাংস, ডিম এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন মুগ, মসুর, সিমের বিচি, বাদাম প্রভৃতি প্রতিদিন খাবারের তালিকায় রাখতে হবে। ভাত ও রুটিতে প্রয়োজনীয় লাইসিন নামের অ্যামাইনো অ্যাসিড অল্প পরিমাণে থাকে, কিন্তু ডালে এর পরিমাণ বেশি থাকে। তাই ভাত ও ডাল বা রুটি ও ডাল—এরূপ মিশ্র খাবারে প্রোটিনের গুণগত মান বাড়ে ও চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে।

সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল ভিটামিনের মূল উৎস, যা শিশুর শরীরে রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। সব ধরনের শাকসবজি, বিশেষ করে ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচা টমেটো, শসা, করলা, লাউ, শজনে, কাঁচা পেঁপে প্রভৃতি বেশি করে খেতে দিতে হবে এবং ফলমূলের মধ্যে সবুজ ও টক ফল দিতে হবে। শিশু যেন পাঁচবারের কম না খায়, এদিকটা মা-বাবাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। অধিক সময় খালি পেটে থাকলে বা পরিমাণের চেয়ে কম খেলে শিশুর ‘হাইপো’ দেখা যায়, যার ফলে শরীর কাঁপতে থাকে, মাথা ঝিমঝিম করে, ঘাম আসে, চোখে ঝাপসা লাগে ও অতিরিক্ত ক্লান্তি আসে। এ অবস্থা বেশিক্ষণ থাকলে শিশু মাথা ঘুরে পড়ে যায়। ‘হাইপো’ বোধ হলে শিশুকে অবশ্যই চিনি বা গুড়ের শরবত, মিষ্টি বা ফলের রস খেতে দিতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সুস্থবোধ করে, ততক্ষণ বিশ্রামে থাকতে হবে।

শিশুর ডায়াবেটিস হলে তার প্রভাব পড়ে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের ওপর। মা-বাবার নিষ্ঠাবান, ধৈর্যশীল ও বন্ধুসুলভ আচরণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুটিও আর দশজন শিশুর মতো হয়ে উঠতে পারে জাতির কর্ণধার।