সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং লাইফষ্টাইল

মানবদেহের রক্তচাপ আদর্শ মাত্রায় থাকা অত্যাবশ্যক। দৈহিক ও মানসিক অস্থিরতা ও কর্মহীনতা ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপের কারণে হার্ট এ্যাটাক, হার্ট ফেইলর, কিডনি ফেইলর, দৃষ্টিহীনতা ও ষ্ট্রোক হতে পারে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য এসব জটিলতা বিরাট বোঝা। বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের জটিলতার চিকিত্সা ব্যয়বহুল এবং কঠিন।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য দুটি পদ্ধতি রয়েছে-

১. জীবন যাত্রার পরিবর্তন

২. উচ্চ রক্তচাপ বিরোধী ওষুধ

জীবন যাত্রার পরিবর্তন বিষয়টি সাধারণ বিচারে যতটা সহজ ভাবা হয় আসলে ততটা সহজ নয়। প্রাত্যহিক কর্মকান্ড ও জীবন যাপনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রয়োজন তীব্র আকাঙ্খা, ত্যাগ স্বীকার, একাগ্রতা মনোযোগ, কঠিন সাধনা ও আত্মীয়-বন্ধুদের সহায়তা।  জীবন যাত্রার পরিবর্তনে অনেকগুলো উপকার পাওয়া যায়। যেমন-

১. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

২. উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা প্রতিরোধ

৩. স্থুলতা ও অকাল বার্ধক্য প্রতিরোধ

৪. রক্তে শর্করা সঠিক রাখা

   (ডায়াবেটিস প্রতিরোধ/নিয়ন্ত্রণ)

৫. উচ্চ রক্তচাপ বিরোধী ওষুধের

    কার্যকারিতা বৃদ্ধি

৬. দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি

৭. দেহের বিভিন্ন তন্ত্রের কাজে সমন্বয় সাধন

৮. ছন্দময় জীবন,

৯. কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি

১০. দুশ্চিন্তাহীন নতুন জীবন।

প্রাথমিক অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের চিকিত্সা বা নিয়ন্ত্রণে জীবন যাত্রার পরিবর্তন ১টি সফল পদ্ধতি যেখানে কোন অর্থব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু রক্তচাপের মাত্রা বেশী হলে বা যে কোন জটিলতা উপস্থিত থাকলে এই ব্যবস্থার পাশাপাশি ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। মনে রাখবেন, অবশ্যই জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তনের কোন বিকল্প নেই।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জীবন যাপনে যেসব পরিবর্তন আনতে হবে

১. পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম: প্রতিদিন ঘন্টায় ৬ কিলোমিটার বেগে কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাত-পা নাড়িয়ে হাঁটতে হবে। রিমোর্ট কন্ট্রোল ব্যবহার না করে নিজেই টিভি, লাইট, ফ্যান, দরজা ও জানালা ইত্যাদি খুলতে ও বন্ধ করতে হবে। প্রতিবার আহারের পর কমপক্ষে ৫ মিনিট হালকাভাবে হাঁটতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, পরিশ্রমের সম্মান ও আনন্দ অন্য কোনভাবে অর্জন করা যায় না। পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই, পরিশ্রম অমূল্য।

২. খাদ্যাভাস পরিবর্তন:

তৈল-চর্বি-মিষ্টি কম খেতে হবে। নিয়মিত প্রচুর শাক-সবজি, ফল, সামুদ্রিক মাছ খেতে হবে। খাবারে ভাতের পরিমাণ কমিয়ে শাক-সবজি বেশী নিতে হবে। গিলা, কলিজা, মাথা, গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্য খাদ্য-খাদ্যের জন্য মানুষ নয়। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ স্বাভাবিক কর্ম- কান্ড ব্যহত করে, বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায় ও দূর্ঘটনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। তাই প্রয়োজনে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। কম কম খেয়ে বেশী দিন বাঁচতে হবে।

৩. ওজন আদর্শ মাত্রায় রাখা-

পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, কায়িক শ্রম এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে দৈহিক ওজন আদর্শ মাত্রায় রাখতে হবে। ওজন অতিরিক্ত হলে অবশ্যই কমাতে হবে। পাঁচ ফুট উচ্চতার জন্য আদর্শ ওজন হচ্ছে ৫৬ কেজি। প্রতি ইঞ্চি উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য ওজন ২ কেজি করে বেশী হতে পারবে। আবার প্রতি ইঞ্চি উচ্চতা হ্রাসের জন্য ওজন ২ কেজির করে কমে যাবে। এভাবে আদর্শ ওজন নির্ণয় করে তা অর্জণ করতে হবে। কোমড়ের মাপ নির্ধারিত হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। পুরুষের জন্য কোমড়ের মাপ ৩৬ ইঞ্চি বা ৯০ সে.মি.-এর মধ্যে রাখতে হবে।   মহিলার ক্ষেত্রে ৩২ ইঞ্চি বা ৮০ সেমি

৪. আলগা লবণ বন্ধ-

কাঁচা কিংবা ভাজা কোনভাবেই আলগা লবণ খাওয়া যাবে না। পাতে লবণ খাওয়া বন্ধ। টেবিলে লবণ দানি রাখার প্রয়োজন নেই। প্রত্যহ ২৩০০ মিলিগ্রাম – এর বেশী সোডিয়াম অর্থ্যাত্ ১ চা চামচ-এর বেশি লবণ খাওয়া যাবে না। লবণাক্ত তরল খাবার, মাছ, বিস্কুট, বাদাম, পনির কিংবা লবণ দিয়ে টক ফল খাওয়া নিষেধ। অনেক রোগী বলেন, কাঁচা লবণ নিষেধ তাই ভেজে লবণ খাই বা কাঁচা/ভাজা কেনো আলগা লবণ খাই না, তরকারিতে বেশী বেশী লবণ খাই। তরকারিতে পরিমিত লবণ খেতে হবে, বেশী নয়। ভাজা ও কাঁচা কোন প্রকারেই আলগা লবণ খাওয়া যাবে না।

৫. ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন –

এ দুটি অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ তথা মানব জীবনের জন্য চরম ক্ষতিকর। জীবন থেকে জীবন কেড়ে নিতে পারে এ দুটি বদ অভ্যাস। ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করতে হবে।

৬. পরিমিত ঘুম ও বিশ্রাম-

প্রতিদিন ৬ ঘন্টা ঘুম ও কাজের ফাঁকে ফাঁকে খানিকটা বিশ্রাম নিতে হবে। প্রতিঘন্টা পরিশ্রমের পর ৫ মিনিটের বিশ্রামে ক্লান্তি দূর হবে, আবার নতুন উদ্যাম ফিরে আসবে।

৭. পর্যাপ্ত পটাসিয়াম গ্রহণ –

দেহে সোডিয়াম বেশী হলে যেমন রক্তচাপ বেশী হতে পারে তেমনি পটাসিয়াম কম হলেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। দৈনিক কমপক্ষে ৪৭০০ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম গ্রহণের জন্য মাংস, দুধ, ফল ও শাক-সবজি খেতে হবে। একটি মাঝারি সাইজের কলায় ৪০০ মিলিগ্রাম ও একটি মাঝারি সাইজের টমেটোতে ৩০০ মিলি গ্রাম পটাসিয়াম রয়েছে। আলাদা ভাবে পটাসিয়াম সিরাপ বা টেবলেট-এর প্রয়োজন নেই।

৮. উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা পরিহার –

সীমাহীন সমস্যাপূর্ণ পরিবেশ কিছুটা কষ্ট করে হলেও উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। মাথা ঠান্ডা রেখে যতটা সম্ভব পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে যেতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব সত্ পথে পালনই মানব ধর্ম। মানুষের জীবনে আদর্শ করণীয় যা ফলাফল না ভেবে তাই করে যেতে হবে। উত্তেজিত হওয়া মানে পরাজিত হওয়া। দুশ্চিন্তা পরিত্যাগ করে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে পারলে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সহজ।

৯. পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো –

উচ্চ রক্তচাপের রোগীর উপর পরিবেশের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাই আত্মীয়, বন্ু, সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় যতটা সম্ভব পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে

১০. ধর্মীয় বিধি নিষেধ মেনে চলা –

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পারিবারিক বন্ধ রক্ষা, ভদ্রোচিত আচার-আচরণ ও কর্মময় জীবন সকল ধর্মে সমর্থিত। তাই সামর্থানুযায়ী ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে।

শেষ কথা : মানুষের জীবনকাল সীমিত। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সব দায়-দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হয়। দৈহিক ও মানসিক সুস্থ্যতার জন্য রক্তচাপ সঠিক মাত্রায় রাখতে হয়। জীবন যাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন মত এই ব্যবস্থার সাথে চিকিত্সকের পরামর্শে ওষুধ যোগ হতে পারে। ওষুধ থাকুক বা না থাকুক জীবনের গতিময়তা রক্ষার জন্য জীবন যাত্রার পরিবর্তন ও ধারাবাহিক ভাবে চলবে। আদর্শ জীবন যাপনের বিকল্প কিছু নেই।