সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

যক্ষ্মার বিভিন্ন রূপ

যক্ষ্মা কোনো মামুলি রোগ নয়। যক্ষ্মা বাংলাদেশের দ্বিতীয় ঘাতক ব্যাধি এবং অন্যতম সামাজিক সমস্যা। যেকোনো বয়সেই যেমন মানুষের যক্ষ্মা হতে পারে, তেমনি শরীরের যেকোনো অঙ্গেই হতে পারে এই রোগ। বলা হয়ে থাকে চুল, নখ এবং দাঁত ছাড়া শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে যক্ষ্মা হতে পারে না।

যক্ষ্মা দুই ধরনের। ফুসফুসের যক্ষ্মা বা পালমোনারি টিবি এবং ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা বা এক্সট্রা পালমোনারি টিবি। বাংলাদেশে প্রতি বছর যক্ষ্মায় যত রোগীর মৃত্যু হয় তার সবই প্রায় ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগী। ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মায় একেবারেই কোনো রোগীর মৃত্যু হয় না তা নয়, তবে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা এতই কম যে শতকরা হিসাবে সেটা মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ফুসফুস ছাড়া শরীরের যেসব অঙ্গে যক্ষ্মা হতে পারে সেগুলো চামড়া, হাড়, মস্তিষ্ক, গ্ল্যান্ড বা গ্রনি’, কান, নাক, হাড়ের আবরণী, চোখ, কিডনি, মূত্রনালী ও প্রজনন নালী, পাকস’লী, জরায়ু ইত্যাদি।

সব যক্ষ্মায় সাধারণত দুই ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। একটি স’ানীয় লক্ষণ অর্থাৎ যে অঙ্গে যক্ষ্মা হয় সেখানকার স’ানীয় লক্ষণ এবং অপরটি সাধারণ লক্ষণ। রোগের প্রতিক্রিয়ার ফলে এই সাধারণ লক্ষণ তৈরি হয় এবং এগুলো সব ধরনের যক্ষ্মায়ই প্রকাশ পায়। যেমন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিকেলে ঘুষঘুষে জ্বর তবে কদাচিৎ এই জ্বর সকালেও হতে পারে। ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস, অকারণে অবসাদ বা ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা, অকারণে ভালো না লাগা, নিদ্রাহীনতা, অকারণে শরীরে ঘাম হওয়া ইত্যাদি। এসব লক্ষণের সাথে স’ানীয় লক্ষণ মিলিয়ে নির্ণয় করা হয় ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা বা এক্সট্রা পালমোনারি টিবি।

সমীক্ষা অনুযায়ী এক্সট্রা পালমোনারি টিবিকে নিম্নে উল্লিখিত ক্রমানুসারে সাজানো যায়
১. লিম্প গ্ল্যান্ড বা গ্রনি’, ২. জেনিটো ইউরিনারি, ৩. ফুসফুসের আবরণী, ৪. মিলিয়ারি, ৫. হাড় ও হাড়ের জয়েন্ট, ৬. কোল্ড অ্যাবসেস, ৭. পাকস’লী ও অন্ত্র, ৮. মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ (মেনিনজাইটিস), ৯. হৃদযন্ত্রের আবরণী ও ১০. চামড়া। এক্সট্রা পালমোনারি টিবির মধ্যে সব থেকে ভয়াবহ হলো মেনিনজিয়াল টিবি (মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ) ও মিলিয়ারি টিবি।

লিম্প গ্ল্যান্ড বা গ্রনি’র টিবি
প্রথম আক্রান্ত গ্ল্যান্ডগুলো ফুলে যায়, লাল হয়। হাত দিলে গরম লাগে। কখনো কখনো গ্রনি’গুলো পেকে ফেটে যায় এবং ঘা ও সাইনাস ফরম করে যা সহজে শুকায় না। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকলে কখনো কখনো ফুলে যাওয়া গ্ল্যান্ডগুলো আপনাআপনি ছোট হয়ে শক্ত হয়ে যায়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কখনো কখনো ফুসফুস এবং অন্যান্য স’ানের ক্যান্সারের জন্যও বয়স্ক লোকের গ্ল্যান্ড ফুলে যেতে পারে। ফুলে যাওয়া গ্রনি’তে হাত দিয়েই চিকিৎসকদের বেশির ভাগ এ পার্থক্য বুঝতে পারেন। এ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। সময়মতো চিকিৎসা করালে গ্ল্যান্ড টিবির সাইনাসজনিত দাগ হতে পারে না।

কিডনি ও মূত্রনালীর টিবি
যক্ষ্মা জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশের পর কিছু জীবাণু রক্তের মাধ্যমে কিডনি ও মূত্রনালীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সে ক্ষেত্রে জীবাণু প্রবেশের ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কিডনি ও মূত্রনালীতে যক্ষ্মা হতে পারে। কিডনি ও মূত্রনালীতে যক্ষ্মা হলে বারবার প্রস্রাবের চাপ হয় এবং ব্যথা হয়। কোনো কোনো সময় ব্যথাটা পিঠের দিকে যায়। সাধারণত এই ব্যথা তেমন বেশি অনুভূত না হলেও কখনো কখনো তা তীব্র হতে পারে। কিডনি আক্রান্ত হলে পেশাবের সাথে রক্ত যেতে পারে, তবে অনেক সময়ই এই রক্তপাতের ঘটনা খালি চোখে না-ও দেখা যেতে পারে। ইংরেজিতে একে বলে মাইক্রোসকোপিক হিমাচুরিয়া। উল্লেখ্য, অনেক সময় কিডনির যক্ষ্মায় এপিডিডাসিম ফুলে যেতে পারে। প্রস্রাবের সাথে পুঁজ পড়তে পারে, তবে ইউরিনের সাধারণ কালচারে কোনো জীবাণু পাওয়া না গেলে এটাকে কিডনির যক্ষ্মা সন্দেহ করা যেতে পারে। কিডনির টিবি খুব বেড়ে গেলে পেছন দিকে ফোড়া হতে পারে।

ফুসফুসের আবরণের (প্লুরাল) টিবি
সাধারণভাবে ফুসফুস যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে এটা অনেক সময় ফুসফুসের আবরণীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কয়েক মাসের মধ্যে আবরণীর মাঝখানে পানি জমে। তখন রোগী বুকের নিম্নাংশে ব্যথা অনুভব করে। প্রথম দিকে ব্যথা বেশি হয় এবং ধীরে ধীরে তা কমে যায়। এর ফলে রোগীর হালকা জ্বরও হতে পারে তবে তা দীর্ঘস’ায়ী হয় না। অল্প অল্প কাশিও হতে পারে। পরিশ্রম করলে শ্বাসকষ্ট হয়। কখনো কখনো ফুসফুসের আবরণীতে পুঁজও হতে পারে এবং বুকের নিম্নাংশে ফেটে গিয়ে এই পুঁজ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।

মিলিয়ারি টিবি
কখনো কখনো যক্ষ্মায় আক্রান্ত স’ান থেকে কোনো না কোনোভাবে যক্ষ্মা জীবাণু রক্তস্রোতে মিশে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ায় শরীরের বিভিন্ন স’ানে ছোট ছোট টিউবার ক্যালসের সৃষ্টি হয়। এভাবে সারা শরীরে যক্ষ্মা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারাই সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হয়। এক্সট্রা পালমোনারি টিবির মধ্যে মিলিয়ারি টিবিই সব থেকে ভয়াবহ। চিকিৎসা না করলে ৯৫ ভাগ রোগীরই মৃত্যু হয়। মিলিয়ারি টিবিতে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি জ্বর হতে পারে এবং রোগী অস্বস্তিবোধ করে।

হাড় ও হাড়ের জয়েন্টের টিবি
কোনো ব্যক্তির ফুসফুসে যক্ষ্মার প্রাথমিক ইনফেকশনের পর যক্ষ্মা জীবাণু রক্তের মাধ্যমে যেকোনো হাড় বা হাড়ের জয়েন্টে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কারো কারো হাড় বা হাড়ের জয়েন্টে টিবি হতে পারে। ফুসফুসে যক্ষ্মা জীবাণু প্রবেশের পর সাধারণত তিন বছরের মধ্যে এ রোগ দেখা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে তিন বছর পরও এ রোগ দেখা দিতে পারে। সাধারণত শিশু ও যুবকদের মধ্যেই এ রোগ বেশি দেখা দেয়। যেকোনো হাড় বা হাড়ের জয়েন্টে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সাধারণত যেসব হাড় বা জয়েন্ট শরীরের ওজন বহন করে সেখানেই এ রোগ বেশি হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রথমত মেরুদণ্ডের হাড় এ রোগে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া হিপ জয়েন্টে, হাঁটু এবং পায়ের পাতার হাড়ে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে বাহু ও হাতের কব্জি বা হাড়ে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ রোগে কোনো কোনো সময় শরীরের নিম্নাংশ অবশ হতে পারে এবং প্রস্রাব ও পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

খাদ্যনালী ও পেটের টিবি
খাদ্যনালী ও পেটের বিভিন্ন স’ানে টিবি হতে পারে যেমন পেটের আবরণ (পেরিটোনিয়াম), ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র্ত, ইসোফেগাস, ফেরিঞ্জ, পাকস’লী, লিভার, স্পিলিন ইত্যাদি। সাধারণত শিশু ও যুবকেরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। যক্ষ্মাক্রান্ত গরুর দুধ না ফুটিয়ে শিশুদের খেতে দিলে, ধুলোবালুতে মিশ্রিত যক্ষ্মা জীবাণু খাবারের সাথে মিলে চামচ বা হাতের আঙুলের মাধ্যমে পেটের মধ্যে প্রবেশ করলে অথবা ফুসফুস থেকে যক্ষ্মা জীবাণু রক্তের মাধ্যমে পেটের আবরণের মধ্যে প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে। এ ছাড়া হৃদযন্ত্রের আবরণ (পেরিকার্ডিয়াম) এবং হৃদযন্ত্রের পেশিতেও এ রোগ হতে পারে। তবে এটা খুব বিরল। এড্রিনাল গ্ল্যান্ড, চামড়া এবং চোখেও টিবি হতে দেখা যায়। কিডনির ওপরে অবসি’ত এড্রিনাল গ্ল্যান্ডে টিবি হলে শরীরে কালো কালো দাগ পড়ে এবং রক্তচাপ কমে যায়। সাধারণত ধুলোবালুতে মিশ্রিত টিবি জীবাণু চোখের মধ্যে প্রবেশ করলে অথবা ফুসফুস এবং পেটের যক্ষ্মা থেকে রক্তের মাধ্যমে যক্ষ্মা জীবাণু চোখে প্রবেশ করলে বা সংক্রামক যক্ষ্মা রোগী কাশি দেয়ার সময় সেটা চোখে প্রবেশ করলেও চোখে যক্ষ্মা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে চোখ চুলকায়, ব্যথা হয় এবং পানি পড়ে। রোগী আলো দেখতে চায় না, চোখের ভেতরে ছোট ছোট হলুদ বা গ্রে দাগ দেখা যায়। চোখ বেশি আক্রান্ত হলে ঘা হয়ে যায়।

চামড়ায় যক্ষ্মা হতে পারে
প্রথমত, চামড়া কেটে গেলে বা ক্ষত হলে বাইরে থেকে যক্ষ্মা জীবাণু সেখানে প্রবেশ করলে চামড়ায় যক্ষ্মা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভেতর থেকে রক্তের মাধ্যমে ওই ক্ষতস’ানে যক্ষ্মা জীবাণু প্রবেশ করলে সেখানে যক্ষ্মা হতে পারে। ক্ষতস’ান সাধারণ নিয়মে শুকিয়ে যায়। কিছু দিন পর ওই স’ানে ঘা হয়। সাধারণত মুখমণ্ডল, হাঁটুর নিচে এবং পায়ের পাতায় এ যক্ষ্মা হয়। তবে হাত বা বাহুতে খুব কম হয়।

লেখক : অধ্যাপক ডা: এ কে এম ডি আহসান আলী, সাবেক পরিচালক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিজেজ অব চেস্ট অ্যান্ড হসপিটাল