সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

মেয়েলি সমস্যা : মাসিকপূর্ব ব্যথা

কিছু কিছু মহিলার মাসিক চক্র শুরু হওয়ার কিছু দিন আগে শারীরিক, মানসিক ও আবেগজনিত কিছু অস্বস্তিকর অবস্থা দেখা দেয়। এই অবস্থাকে প্রিম্যানুস্ট্রাল সিনড্রোম বলা হয়। বাস্তবে কিন্তু প্রায় ১৫০ রকমের সমস্যা বা উপসর্গ এই অবস্থায় দেখা যেতে পারে। তবে যে ক’টি খুব বেশি কমন উপসর্গ দেখা যায়, সেগুলো হচ্ছে হতাশা, টেনশন, দুশ্চিন্তা, মনের অস্থিরতা, রাগ হওয়া, মনোযোগের অভাব, অবসাদগ্রস্ততা, ওজন বাড়া, শরীরে পানি জমা, পেট ফোলা, স্তনে ব্যথা, হাড় অথবা মাংসপেশিতে ব্যথা, বমি ভাব, বমি হওয়া, মাথা ব্যথা ইত্যাদি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, শতকরা ৪০ ভাগ মহিলার এ সমস্যা খুবই তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। যার ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।

(এটা প্রতি মাসের মাসিক শুরুর সাত থেকে চৌদ্দ দিন আগে দেখা দিতে পারে)

অনেকের মতে, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। অন্য দিকে অনুন্নত দেশেও শিক্ষার হার কম দেশগুলোর এ ধরনের সমস্যা খুবই কম। পিএমএস ঋতুবতী মহিলার যেকোনো বয়সেই হতে পারে। যাদের কখনো হয়নি এমন মহিলার বেলায়ও দেখা গেছে মাঝ বয়সে অথবা সন্তান হওয়ার পর কিংবা হঠাৎ করে এমনিতেও হতে পারে।

রোগ নির্ণয় : পিএমএস নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ল্যাবরেটরি টেস্ট নেই। চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর মাসিকের ইতিহাস শুনে উপসর্গ দেখে শনাক্ত করে থাকেন। আগে যে লক্ষণগুলোর কথা আলোচনা হয়েছে, এগুলো যদি কোনো মহিলার পিরিয়ড শুরুর এক সপ্তাহ আগে শুরু হয় এবং পিরিয়ড শুরু হলে তার উপসর্গ চলে যায় এবং পিরিয়ড শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ কোনো উপসর্গ যদি না থাকে তাহলে এ ধরনের মহিলার পিএমএস ডায়াগনোসিস করা যাবে। এই ডায়াগনোসিস করা জরুরি। কারণ, রোগ নির্ণয় হলে সঠিক চিকিৎসাব্যবস্থা দেয়া যায়। অন্য দিকে অন্য কিছু রোগ অথবা সমস্যার একই রকম উপসর্গ দেখা দিলে রোগ নির্ণয় অসুবিধা হতে পারে। যেমনÑ পিল খেলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, ব্যথামুক্ত মাসিক খাবারে অসুবিধা, হতাশা, মানসিক রোগ ইত্যাদি।

এখন আসুন আলোচনা করি কেন পিএমএস হয়। আজ অবধি পিএমএসের কোনো কারণ নির্দিষ্ট হয়নি। এ ব্যাপারে এখনো গবেষণা চলছে। কারণ উদ্ঘাটনে বেশ কিছু থিওরি রয়েছে। নিম্নে এগুলো বর্ণনা করা গেল।

১. প্রস্টাগ্লানডিন : প্রতিটি মাসিক চক্রে যেহেতু মহিলাদের জরায়ুর ভেতরের গাত্রে ক্ষরণ হয়ে থাকে; ফলে প্রস্টাগ্লানডিন নামক হরমোন নিঃসরিত হয়ে রক্তপ্রবাহে মিশে প্রস্টাগ্লানডিন তৈরি হওয়ায় জরায়ু গাত্র দৃঢ় ও সংকোচনের ফলে ব্যথা শুরু হয়। এ ধরনের ব্যথায় এসপিরিন, প্যারাসিটামল, ইকরুফেল ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।

২। প্রজেসটেরন : মাসিক চক্রে ওভারি বা ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন ওভ্যুলেসন হয় না, তাদের পিএমএসও হয় না। গর্ভাবস্থায় এই মহিলাদের এনে দিতে পারে স্বস্তি। কোনো কারণে মহিলাদের দেহে পুরুষ সেক্স হরমোন বেড়ে গেলে অথবা প্রোল্যকাটন বেড়ে গেলে ওভ্যুলেসন পিছিয়ে যায় প্রোজেসটেরনও তৈরি কমে যায়। ফলে পিএমএস দেখা দিতে পারে।

হরমোনের তারতম্যের কারণে জরায়ুর বাইরের অংশে এক ধরনের টিস্যুর আস্তরের মতো আবরণ পড়ে, যেমনটি দেখা যায় রক্ত জমাট বেঁধে গেলে। আর এই জমাট বাঁধা টিস্যুগুলো আগের টিস্যুতে চাপ দেয়, ফলে ব্যথার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় হরমোনজনিত কারণে স্তনে ছোট ছোট দানার সৃষ্টি হয় (যদিও এগুলো থেকে কখনো ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নেই)। মাসিক হওয়ার আগে  স্তনে ব্যথা ও ভারী ভাব অনুভূত হয়।

৩। সেরোটোনিন : এটি একটি কেমিক্যাল যা মস্তিষ্ক থেকে উৎপাদিত হয়। এর ক্ষরণ কমে গেলে পিএমএস হতে পারে। সেরোটোনিন দেহে সংঘটিত অনেক কার্যকেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। স্ত্রী সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রজেসটেরণ নিয়ন্ত্রণ, আমাদের ঘুমের সেল বা চক্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেসব নারী মাসিকপূর্ব ব্যথায় ভোগেন, তাদের মস্তিষ্ক থেকে সেরোটোনিন কম হয় অথবা ক্ষরণে তারতম্য হয়ে থাকে। ফলে ডিম্ব নিঃসরণে বা ওভ্যুলেসনে সমস্যা দেখা দিয়ে থাকেÑ তা সমস্যা না  হয়ে আগে বা পরে হয়ে থাকে।

৪। মানসিক কারণ : বেশি আধুনিক জীবনে অভ্যস্ততার ফলে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। ফলে অনেক মহিলা টেনশন বা স্ট্রেসে ভুগে থাকেন। এ ধরনের মহিলারাই সবচেয়ে বেশি পিএমএসের শিকার। মুড, চিন্তাধারা, কল্পনা, আত্মবিশ্বাস, নিজস্ব ধারণা এই অবস্থাগুলো মস্কিষ্ক দ্বারা (Choreographed) আলোড়িত হয়ে থাকে। এ ধরনের কারণে তাই চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীকে সুপরামর্শ ও অন্যান্যভাবে সাইকোথেরাপির মাধ্যমে মনের অবস্থাকে পরিবর্তন করা হয়, যাতে তারা উপকৃত হতে পারে।

৫। ভিটামিনের প্রভাব : গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, দেহে ভিটামিন ই ও বি৬-এর অভাবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন স্ত্রী সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেনের মাত্রার তারতম্য হয়ে দেহের বিভিন্ন স্থানে পানি জমতে পারে; পরিণতিতে মাসিকপূর্ব ব্যথা।

চিকিৎসাব্যবস্থা : মাসিকপূর্ব ব্যথা বা পিএমএস যেহেতু কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণের প্রভাবে হয় না, তাই চিকিৎসাব্যবস্থার আগে মূল কারণ ঠিক করা দরকার। পরবর্তী সময়ে সতর্কতার সাথে চিকিৎসা শুরু করা উচিত। কারণ এতে একসময় এ সমস্যা অনেকেরই জানা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এ নিয়ে বেশ চিন্তাভাবনা ও গবেষণা চলছে।

  • বেশির ভাগ এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্তদের থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা থাকতে পারে। তাই চিকিৎসার আগে থাইরয়েডের অবস্থা জানা দরকার।
  • জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহারে কারো কারো ওভ্যুলেসনের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তাই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হতে পারে।
  • ওষুধের মধ্যে রয়েছে ডিপো প্রোভোর-এর ব্যাপারে ওভ্যুলেসন এবং মাসিক ক্ষণস্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায় (বিশেষ করে যাদের সমস্যা মারাত্মক আকারে হয়ে থাকে)।
  • অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ স্বল্প মাত্রার প্রয়োগে সমস্যা লাঘব হয়। বিশেষ করে যাদের উপসর্গগুলো মূলত মানসিক।
  • দেহে পানি জমলে স্লাইরোনোলেটোন ওষুধ হরমন ক্ষরণের তারতম্য রোধ করতে চেষ্টা করে।
  • ব্লাড প্রেসারের ওষুধ এড্রিনাল নিঃসরণের গতি পাল্টায়। ফলে পিএমএসে যে অবসাদ ও টেনশন দেখা যায়, তাতে উপকার পাওয়া যায়।
  • যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম পিএমএসের যন্ত্রণা কমাবে। তবে প্রতিদিন এক গ্রাম ক্যালসিয়াম খেতে হবে।
  • ৪০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রতিদিন খেলেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
  • ষভিটামিন ই নিয়মিত খেলে এবং ভিটামিন বি৬ পিএমএসের অবসাদ কমায়। বিশেষ করে এই সময়ে স্তনে ব্যথা হলে উপকার হবে।

আরো কিছু করণীয়

  • শরীরের ওজন সুস্থ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • লবণ এবং লবণ মিশ্রিত খাবার কমাতে হবে।
  • বিশেষ করে পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগে এতে দেহে পানি জমা কমবে।
  • কফি, চা, কোলা খাওয়া বর্জন করতে হবে। এতে টেনশন ও স্তনে ব্যথা কমবে।
  • শর্করাজাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। যেমন রুটি, আলু, শস্যদানা, শাকসবজি ও ভাত।
  • তেল, ঘি বেশি না খাওয়াই ভালো।
  • প্রচুর পানি খাবেন।