সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

মৃগী রোগীকে অবহেলা নয়

মৃগীরোগ এমনই অবস্থা যখন রোগীর বাহ্যিক জ্ঞান লোপ পায় হঠাত্ এবং প্রায়ই এই অবস্থা ঘটে ও রোগী জ্ঞান হারায়। অনেক সময়ে রোগীর হাত-পায়ে খিঁচুনি দেখা যায়। তবে সব মৃগী রোগেই খিঁচুনি থাকে না। বুদ্ধির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া, মস্তিষ্কের জড়তা যেসব শিশুর মধ্যে দেখা যায় তাদের মধ্যে আবার কোনো কোনো শিশু মৃগীরোগগ্রস্ত হয়ে থাকে।

বিভিন্ন ধরনের মৃগীরোগ রয়েছে—
— বড় ধরনের মৃগীরোগ বা মেজর এপিলেপসি
— মৃদু মৃগীরোগ বা মাইনর এপিলেপসি
— টেম্পোরাল লোব মৃগীরোগ

মৃদু মৃগীরোগ
এই মৃগীরোগে হাতে-পায়ে প্রবল খিঁচুনি বা ঝাঁকুনি দেখা না গেলেও রোগী অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই ধরনের মৃগীরোগকে বলা হয় পেটিট-মল। যেসব ছেলেমেয়ের পেটিট-মল জাতীয় মৃগীরোগ হয় হঠাত্ তারা অন্যমনস্ক হয়ে যায়, কথা বলতে বলতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে যায়, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অথবা চোখের মণি নড়তে থাকে, কখনও হাত, মাথা কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে থাকে। পেটিট-মল ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের মৃদু মৃগীরোগ দেখা যায়।

এগুলো যে কোনো বয়সে হয়ে থাকে এবং কোনো কারণ থাকতেও পারে আবার অনেক সময় কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

এ ধরনের মৃগীরোগ হলো—
টেম্পোরাল লোব মৃগীরোগ
এই ধরনের মৃগীরোগ মস্তিষ্কের ঠিক টেম্পোরাল অংশেই বিশৃঙ্খলা দেখা যায় কিনা তার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় গুরুমস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সে ক্ষেত্রে গ্র্যান্ড মল মৃগীরোগের লক্ষণ অর্থাত্ হাত-পায়ে খিঁচুনি দেখা যেতে পারে। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা জানানোর জন্য যে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা আছে যেমন ইইজি করলে কী ধরনের মৃগীরোগ হয়েছে জানা যেতে পারে।

টেম্পোরাল লোব মৃগীরোগের লক্ষণ
—সংবেদন মৃগীরোগ : এ ধরনের মৃগীরোগে হাতে-পায়ে ইলেকট্রিক শক লাগার মতো অনুভূতি হয়, কিন্তু রোগী জ্ঞান হারায় না।
—হঠাত্ নাকে বিভিন্ন ধরনের গন্ধ অনুভব করে, কানে শব্দ শোনে। এই সময়ে ঠোঁট, জিভ, মুখ নড়তে থাকে। রোগী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
—অনেক সময় কারণে-অকারণে অসংলগ্ন উদ্দেশ্যহীন আচরণ করা ছেলেমেয়েরা হঠাত্ সবার সামনে জামাকাপড় খুলে ফেলে, গালাগাল দেয়, মারতে ওঠে।
—জ্যাকসনিয়ান মৃগীরোগ : এ ধরনের মৃগীরোগে বুড়ো আঙুলে (হাত বা পায়ের) অথবা চোয়ালে মৃদু কাঁপুনি দেখা যায়।

বড় ধরনের মৃগীরোগ
এ ধরনের মৃগী রোগীর উল্লেখযোগ্য লক্ষণ রোগাক্রান্ত অবস্থায় হাত-পায়ে খিঁচুনি। যেসব ছেলেমেয়ের গ্র্যান্ড মল এপিলেপসি হয় তারা ফিট হওয়ার আগেভাগে—
— ইনসুলিন ও
— নানা রকমের ওষুধ
রক্ত চলাচলে যদি বিঘ্ন ঘটে যেমন—
— মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (সেরিব্রাল হেমারেজ)
— গর্ভাবস্থায় উচ্চরক্তচাপ
— এক্লামশিয়া
খুব বেশি জ্বর হওয়ার সঙ্গে ছেলেমেয়েদের ফিট বা তড়কা হতে পারে।

মস্তিষ্কে যদি কোনো কারণে অক্সিজেনের অভাব হয়, যেমন—
— কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং
— খুব বেশি রক্তাল্পতা
অন্যান্য কারণ যেমন—
— ইউরেমিয়া
— হেপাটিক ফেলিওর
— প্যারা থাইরয়েডিজম
— টিটেসি
— রিকেট

আকস্মিক বিপর্যয়ের ফলে চরম মানসিক আঘাত প্রতিক্রিয়ায় এক ধরনের মৃগীরোগ হয়ে থাকে। ইডিওপ্যাথিক আপাতত মৃগীরোগের কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। মৃগীরোগ সম্বন্ধে সন্দেহ হলে সম্পূর্ণ পরীক্ষা ইইজি প্রভৃতি করানো দরকার। চিকিত্সকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। মৃগীরোগাক্রান্ত ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে অক্ষম—এ কথা ভাবা ঠিক নয়।

অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চলতে হবে। ছেলে বা মেয়ে স্কুলের লেখাপড়া বা সামান্য খেলাধুলা সবই করতে পারবে। তবে সাঁতার কাটা বা হঠাত্ অজ্ঞান হয়ে গেলে বিপদ ঘটতে পারে। এ রকম কাজকর্ম থেকে সাবধানে থাকতে হবে। উত্তেজনা, প্রচ শব্দ বা কোলাহল, জ্বর প্রভৃতি মৃগীরোগের আক্রমণের তীব্রতাকে বাড়িয়ে দেয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মৃগী রোগাক্রান্ত ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেক সময়ই বিভিন্ন মানসিক রোগ দেখা যায়। আবার অনেকের ব্যক্তিত্ব বা আচরণ সংক্রান্ত সমস্যা বিশেষ করে যাদের টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি থাকে তাদের দেখা যায় উত্তেজনা, বিরক্তি, হাসা এ ধরনের সমস্যা।

অনেক সময় দীর্ঘদিন মৃগীরোগের ওষুধ খেলে ধৈর্য, একাগ্রতা, মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। মৃগীরোগীর সুস্থতার জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া দরকার।

অধ্যাপক ডা. এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ : পরিচালক, মনোজগত সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা