সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

মুখের সমস্যা ও ডায়াবেটিস

মুখের ভিতরে সাধারণত যে সমস্ত রোগগুলো দেখি সেগুলো হচ্ছে ডেন্টাল ক্যারিজ, মাড়ির রোগ ও পেরিওডেন্টাল ডিজিজ, মুখের ক্যান্সার, অসমান দাঁত, ডেন্টাল সিস্ট ইত্যাদি। দেহের অন্যান্য রোগের জন্য মুখের মধ্যে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিত্সা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রায় দুইশত রোগের প্রাথমিক লক্ষণ মুখগহ্বরে প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়।

বর্তমান কালের মরণঘাতী রোগ এইডস থেকে শুরু করে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, এমনকি গর্ভাবস্থায়ও অনেক রোগের লক্ষণ মুখের ভিতরে প্রকাশ পায়। যে সমস্ত ডায়াবেটিক রোগী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখেন না তাদেরই মাড়ির রোগের প্রদাহ বা পেরিওডন্টাল ডিজিজ অধিকমাত্রায় লক্ষণীয়। তবে তার অর্থ এই নয় যে, যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদেরই এই রোগ বেশি হবে। 

পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাদের মুখে ডেন্টাল প্লাক রয়েছে এবং জিনজিভাইটিস রয়েছে তাদের ডায়াবেটিস এর কারণে এই মাড়ির রোগ আরও বেড়ে যায় এবং প্রদাহ তীব্রতর আকার ধারণ করে, পরবর্তীতে দাঁতগুলো পড়ে যায়। মুখের আরও একটি বিশেষ রোগ হচ্ছে মুখের ঘা। মুখের এই ঘা নানা কারণে হতে পারে- যেমন যাদের বিভিন্ন রোগ রয়েছে যেমন ডায়াবেটিস, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রিউমেটিক ফিভার, রক্তস্বল্পতা, ক্যান্সার, এইডস ইত্যাদি রয়েছে তাদের মুখেও ঘা লক্ষ্য করা যায়। যাদের ডায়াবেটিস বা হূদরোগ রয়েছে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং দীর্ঘদিন যাবত্ ওষুধ গ্রহণ করছে তাদের মুুখেও এক ধরনের জীবাণু বিস্তার লাভ করতে পারে, যেমন তাদের মুখে ক্যানডিডা জীবাণুর কারণে ক্যানডিডিয়াসিস হতে পারে।

আরও যে সমস্ত ঘা হতে পারে সেগুলোর মধ্যে লিউকোমিয়া, লাইকেন প্লানাস ইত্যাদি রয়েছে। লক্ষ্য রাখতে হবে মাড়িতে প্লাক জমা রয়েছে কিনা, যদি থাকে তবে তা অবশ্যই স্কেলিং করিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মুখে আরও একটি ঘা সব বয়সেই হতে পারে এর নাম এপথাস আলসার। বিশেষ কোন ভিটামিন বি স্বল্পতা, কোন দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, মুখের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে এপথাস আলসার বেশি হয়।

অনেক সময় এই ঘা আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তবে উপযুক্ত সময়ে এই ঘায়ের চিকিত্সা করাতে পারলে ভালো। এই রোগের চিকিত্সা হলো দুুশ্চিন্তা দূর করা, ঘুম যাতে স্বাভাবিক হয় তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া এবং ওরাবেস জাতীয় মলম ষ্টেরয়েড  স্থানীয়ভাবে ঐ স্থানে লাগিয়ে ঘা-টিকে তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করা। সমপ্রতি আমাদের দেশে এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে (বিশেষত ভারতে) গবেষণায় দেখা যায় যে, যাদের ধূমপান এবং জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে তাদের মধ্যে মুখের ঘা খুব বেশি হয় এবং সেই সাথে মুখে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। 

বিশেষত যারা পানের সঙ্গে জর্দা খান এবং নিয়মিত অনেকবার পান খান তাদের মুখের ঘা বেশি হয় এবং লক্ষ্য করা গেছে অনেকেই তামাক পাতাকে হাতের মধ্যে নিয়ে চুনের সঙ্গে মিশিয়ে গালের মধ্যবর্তী স্থানে রাখেন। তাতে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ঐ স্থানে ঘা হতে পারে। শুধু ঘা নয় পরবর্তীতে এই ঘা ক্যান্সারেও রূপ নিতে পারে। যারা নিয়মিত ধূমপান করেন এবং তামাক পাতা জর্দা দিয়ে পান অথবা তামাক পাতা গালের মধ্যে রেখে ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে শতকরা ১০০ জনের মুখের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যারা জর্দা খান বা তামাক পাতা খান তাদের রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকি হতে পারে ৫০ ভাগ এবং যারা ধূমপান করেন এবং সেই সাথে তামাক পাতাও পানের সঙ্গে ব্যবহার করেন তাদের ঝুঁকি শতকরা ১০০ ভাগ। সুতরাং যাদের মুখের ঘা রয়েছে তাদের এই সমস্ত অভ্যাস অবশ্যই ছাড়তে হবে।

পরীক্ষা করে দেখা গেছে যারা এই সমস্ত অভ্যাস ছাড়তে পেরেছেন তাদের মুখের ঘা থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিত্সার পরও মুখের ঘা যদি দু’সপ্তাহ থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসী অথবা মাংশের টিস্যু পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কারণ মুখে এই সমস্ত অনেক ঘা বা সাদা ক্ষতগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলে থাকে প্রি-ক্যান্সার লিশন বা ক্যান্সারের পূর্বাবস্থার ক্ষত।

সুতরাং মুখের ঘা প্রতিরোধে দাঁত ও মুখের যত্ন নিবেন এবং সেই সমস্ত ঘা দেখা দেয়া মাত্রই চিকিত্সার ব্যবস্থা নিবেন। মুখের ঘা ক্যন্সার প্রতিরোধে আজই ধূমপান ও সেই সাথে তামাক পাতা বা জর্দ্দার ব্যবহার বন্ধ করুন এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ এবং হূদরোগের মত রোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ব্যবস্থা মেনে চলুন। কারণ প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই শ্রেয়, সস্তা ও নিরাপদ।

তামাকজাত দ্রব্য ও ধূমপান আমাদের দেহ ও পরিবেশকে অনেক ক্ষতি করতে পারে; কারণ-

১. একটি সিগারেটের ধোঁয়ায় পনেরো বিলিয়ন পদার্থের অনুসমূহ (ক্ষুদ্রকণা) থাকে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

২. ধূমপান ও তামাক গ্রহণের ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হূাস পায়

৩. ধূমপায়ীদের মধ্যে পুরুষত্বহীনতার সংখ্যা অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশী

৪. ধূমপানের কারণে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ এবং অন্ধও হতে পারে।

৫. ধূমপান মস্তিষ্কের রক্তের প্রবাহ কমিয়ে দিয়ে স্ট্রোকের কারণ ঘটায়।

৬. বিশ্বে প্রতিবছর কমপক্ষে বিশ লক্ষ লোক ধূমপানের ফলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়

৭. ফুসফুসের ক্যান্সারে যত লোক প্রাণ হারায় তাদের শতকরা ৮৫ জন ধূমপানজনিত কারণে।

৮. ক্রণিক ব্রঙ্কা ইটিস এবং হূদরোগের যথাক্রমে ৭৫% ও ২৫% ধূমপানজনিত কারণে।

৯. যারা ধূমপান বন্ধ করে দেন তারা অন্তত ধূমপায়ীদের চেয়ে দীর্ঘায়ূ।

১০. ধূমপায়ী পিতা-মাতার সাথে একই ঘরে থাকলে শিশুদের বড় হয়ে হূদরোগে এবং ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে।

দ’টি ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব

১. তামাক ও ধূমপানজনিত কারণে মুখের ও ফুসফুসের ক্যান্সার।

২. হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসজনিত কারণে লিভার ক্যান্সার।

প্রথমটির প্রতিরোধ ব্যবস্থা: তামাক ও ধূমপান বন্ধ করুন।

দ্ব্বিতীয়টির প্রতিরোধ ব্যবস্থা : হেপাটাইটিস প্রতিষেধক টিকা নিন।