সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ব্রংকিয়েকটিসিস : দীর্ঘস্থায়ী বক্ষব্যাধি

ব্রংকিয়েকটিসিস একধরনের বক্ষব্যাধি। এর লক্ষণ ও উপসর্গ অনেকটা যক্ষ্মার মতোই। তাই এ দু’টি রোগ নির্ণয়ে অনেক সময় ভুল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রচুর রোগী অযথা যক্ষ্মা রোগের ওষুধ মাসের পর মাস বিনা উপকারেই খেয়ে চলেছেন। হিসাব কষলে দেখা যাবে, ব্রংকিয়েকটিসিস রোগে আক্রান্ত রোগী সংখ্যায় নেহায়েত কম নয়, যদিও অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের আগে এর উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।
এটা ফুসফুসের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের ফলে ফুসফুসের শ্বাসনালীতে বড় ধরনের প্রদাহ দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থানের শ্বাসনালীগুলো তখন ফুলে মোটা হয়ে যায়।

ব্রংকিয়েকটিসিসের বিশেষ কতগুলো কারণ আছে। সেগুলো হলো

ইনফেকশন : ফুসফুসে ইনফেকশনই এ রোগের অন্যতম কারণ। এ ইনফেকশন সাধারণত বিভিন্ন ধরনের জীবাণু দিয়ে হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাসজনিত হামে আক্রান্ত হওয়ার পর ব্রংকিয়েকটিসিস হয়ে থাকে। এ ছাড়া ডিপথেরিয়া ও হুপিংকাশি হলেও এসবের জটিলতায় এ রোগ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক যক্ষ্মা বা প্রাইমারি টিউবারকুলোসিস হওয়ার পর এ রোগ হতে পারে। তবে যক্ষ্মাজনিত ব্রংকিয়েকটিসিস সাধারণত বয়স্কদের বেশি হতে দেখা যায়।

বাধা বা অবস্ট্রাকশন : শ্বাসনালীতে বাইরের কোনো পদার্থ ঢুকে গেলে বা কোনো টিউমার থাকলে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে এ রোগ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসনালীর বাইরে কোনো লিস্কগ্ল্যান্ড থাকলে বাইরে থেকে তার চাপে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যেতে পারে। উল্লিখিত যেকোনো কারণে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধ নালীতে দূরবর্তী অংশের বাতাস ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং সেই অংশে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। সেই প্রদাহের ফলে শ্বাসনালীর ক্ষতি হলে ব্রংকিয়েকটিসিসের সৃষ্টি হয়।

বংশগত কারণ : অনেক ক্ষেত্রে বংশগত কারণেও এ রোগ হতে পারে। এ কারণে শ্বাসনালীর অভ্যন্তরে সিলিয়া নষ্ট হয়ে যায়। তার ফলে শ্বাসনালীর লালাজাতীয় পদার্থ ঠিকমতো বের না হয়ে ফুসফুসে জমা হয় এবং সেখানে ক্ষত সৃষ্টি করে। বংশগত কারণে এ রোগ সাধারণত শিশুকালেই হয়।

নিউমোনিয়া : যেকোনো জীবাণু দিয়ে বা যেকোনো বয়সেই নিউমোনিয়া হলে এবং তার ভালো চিকিৎসা না করলে ব্রংকিয়েকটিসিস হতে দেখা যায়। ব্রংকিয়েকটিসিসের অন্যতম উপসর্গ হলো দীর্ঘস্থায়ী কফ-কাশি। বেশির ভাগ রোগীই আমাদের কাছে আসে কাশির সাথে প্রচুর কফ পড়ার সমস্যা নিয়ে। ঘুম থেকে সকালে ওঠার পর কাশি বেশি হয়। একটু কাশিতেই প্রচুর কফ বেরিয়ে আসে। কফের রঙ সাদা হয়।

তবে কোনো জীবাণু সংক্রমণ হলে কফ হলুদ ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে। অনেক রোগীই কফের সাথে রক্ত পড়ার সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে এসে থাকেন, তখন যক্ষ্মা ভেবে ভুল করে অনেক সময় যক্ষ্মার ওষুধও খেতে বলেন। এ রোগে রোগী রক্তস্বল্পতায় ভুগে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আঙুলের মাথা মোটা হয়ে যায়। যাকে আমরা কাবিং বলে থাকি যেটা যক্ষ্মা রোগে হয় না। অনেক দিন ধরে এ রোগ চলতে থাকলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরে হার্ট ফেইলিওর হয়ে পায়ে পানি আসে, বুক ধড়ফড় করে এবং পেটের ডান পাশ ব্যথা করে। এ রোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে রোগী যক্ষ্মায় ভুগছে, না ব্রংকিএকটিসিস ভুগছে, সেটা শনাক্ত করা।

আমরা এ রোগ নির্ণয়ে বুকের এক্স-রে, ব্রংকেগ্রোম এবং সিটি স্ক্যানিং করে থাকি। কফের কালচার করে দেখতে হয় যে জীবাণু কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে মারা যাবে এবং সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর এক কোর্স দীর্ঘমেয়াদি ভালো অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয় এবং কফ দুর্গন্ধযুক্ত হলে আমরা মেট্রোনিডাজল দিয়ে থাকি। শুধু অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই এ রোগ সারে না, সুষ্ঠু চিকিৎসার জন্যে পোসচুরাল ড্রেইনেজের মাধ্যমে আমরা রোগীকে বেশি কফ ফেলতে উপদেশ দেই, উৎসাহিত করি। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত ফুসফুসে অংশ ফেলে দেই।

ব্রংকিয়েকটিসিস খুবই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এ রোগের চিকিৎসাও খুব দীর্ঘমেয়াদি। তাই চিকিৎসার চেয়ে শিশু বয়সে হাম ও হুপিং কাশি, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া বা ডিপথেরিয়া হলে তার সুষ্ঠু চিকিৎসার প্রতি নজর ও লক্ষ রাখলে এ রোগ হওয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়।