সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা

দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হই। কখনও কখনও এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে, যা একেবারেই অনভিপ্রেত ও আকস্মিক। হয় নিজেরাই সে দুর্ঘটনার শিকার হই অথবা হই প্রত্যক্ষদর্শী। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে কোনোভাবেই সেই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই না কেন, তা আমাদের চিন্তাজগতকে এলোমেলো করে দেয়, আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। এ ধরনের ঘটনা আমাদের মনে চাপ ও কষ্টের সৃষ্টি করে। কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। যোগ হয় নতুন নতুন উপসর্গ। অথবা প্রাথমিকভাবে কোনো সমস্যা না হলেও পরে এমনকি বছর কয়েক পরও এ দুর্ঘটনার সূত্র ধরেই মানসিক অসুস্থতার শিকার হতে পারেন অনেকে।

বিপর্যয়-পরবর্তী এই মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা বা পিটিএসডি দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো দুর্ঘটনার গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় কোনো দুর্যোগের প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। সিডর, আইলা, সুনামির মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টর্নেডো, হারিকেন, বন্যা, ভূমিকম্প অথবা উপসাগরীয় বা ইরাক-যুদ্ধ, ৯/১১-এর মতো সন্ত্রাসবাদ, অপহরণ, যৌন নির্যাতন বা সড়ক দুর্ঘটনার মতো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের শিকার বা প্রত্যক্ষদর্শীরা পরে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপের উপসর্গগুলো ব্যক্তির জন্য প্রবল যন্ত্রণাদায়ক। এসব উপসর্গ ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন-যাপনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ভয়ঙ্কর ওই দুর্ঘটনার দুঃসহ স্মৃতি বার বার ফিরে আসে। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনো শব্দ, দৃশ্য বা আলোচনা ব্যক্তির মনে সে স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে। চলমান ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই স্মৃতি। মনে হয় যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে জীবনে। ব্যক্তি একই রকম ভয়, আতঙ্ক, বেদনা অনুভব করেন, যেমন অনুভূতি হয়েছিল প্রকৃত ঘটনাটির সময়। রাতে ঘুমাতে গেলেও দুঃস্বপ্নে হানা দেয় সেই স্মৃতি।

বেদনাদায়ক পরিস্থিতিটি মনে করিয়ে দিতে পারে এ ধরনের ঘটনা বা ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলেন অনেকে। নির্দিষ্ট ওই ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা বা আলোচনা থেকে দূরে থাকেন। নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন চারপাশ থেকে। আগে যেসব কাজ করতেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, সেসব কাজে আর উত্সাহ পান না। লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন। নিজের আবেগ-অনুভূতিও যেন প্রকাশ করতে পারেন না। অনেকে আবার ভয়াবহ দুর্ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যান অজান্তেই।

কেউ কেউ আবার হয়ে পড়েন অস্থিরচিত্ত। তারা উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত আচরণ করেন, সব সময় যেন কোনো বিপদাশঙ্কায় মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক থাকেন। কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না, ঘুম কমে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে শারীরিক নানা সমস্যা যেমন—মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বা ম্যাজম্যাজ করা, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা, খাওয়ায় অরুচি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। জীবনটা যেন অর্থহীন হয়ে যায়। এ কারণে বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপে আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় অন্যদের চেয়ে বেশি। অনেকে মাদকাসক্তও হয়ে পড়েন।

‘ইন্টারন্যাশনাল পোস্ট-সুনামি স্টাডি গ্রুপ’ ২০০৪-এর ডিসেম্বরের সুনামির আঘাতের ২০-২১ মাস পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রীলংকার দক্ষিণাঞ্চলের পেরালিয়া জেলার অধিবাসীদের ওপর এক গবেষণা চালান। গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের ২১ শতাংশ পিটিএসডি, ১৬ শতাংশ মারাত্মক বিষণ্নতা, ৩০ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত। আরও ২২ শতাংশের মাঝে দেখা যায় নানা শারীরিক উপসর্গ, যা মূলত মানসিক চাপ থেকে সৃষ্ট। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি তাদের পারিবারিক, পেশাগত ও সামাজিক জীবনে মানিয়ে নিতে প্রবল মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। জাপানে সম্প্রতি সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বিপর্যয়ের শিকার বা প্রত্যক্ষদর্শীদের উল্লেখযোগ্য অংশ পিটিএসডিসহ নানা মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

অধিকাংশ মানুষই জীবনে কখনও না কখনও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হন। তবে সবার ক্ষেত্রে বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপ একই মাত্রায় প্রকাশ পায় না। প্রতিকূল পরিস্থিতির ধরন, তীব্রতা, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ব্যক্তিগত দক্ষতার (কোপিং মেকানিজম) ওপর এই বহিঃপ্রকাশ নির্ভর করে। সাধারণত মহিলারা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। যাদের নিকটাত্মীয়ের মানসিক রোগের ইতিহাস আছে, যারা শৈশবে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় নয়, তাদের ক্ষেত্রে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

আশার কথা হচ্ছে, মানসিক চাপে অসুস্থ ব্যক্তিরাও চিকিত্সার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এজন্য ওষুধ এবং বিশেষ কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি—উভয়ের সমন্বয়ে ব্যক্তির চিকিত্সা করা হয়। আর দুর্যোগ-পরিস্থিতির পরপরই আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রশিক্ষণসহ তাদের আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেয়া হলে পরে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

লেখক : ডা. মুনতাসীর মারুফ, সহকারী রেজিস্ট্রার, মানসিক রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল