সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

বর্ষাকালে ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ

বর্ষাকালে ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণবর্ষার আগমনে আমাদের জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলে থাকে। বর্ষার কারণে রোগজীবাণু খুব সহজেই ছড়ানোর সুযোগ পায় বলে এ সময়ে বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে পানিবাহিত রোগ, যেমন টাইফয়েড, জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ.ই), ডিসেন্ট্রি, কৃমিসংক্রমণ ইত্যাদির সাথে দেখা দিয়ে থাকে ত্বকের ফাঙ্গাসজনিত ইনফেকশন। তা ছাড়া বর্ষা জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে বাড়িয়ে দেয় স্বাস্থ্যঝুঁকি। সুতরাং বর্ষায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসমস্যা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সতর্কতা ও সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

বর্ষায় ফাঙ্গাস
বৃষ্টিভেজা আর্দ্র পরিবেশে ফাঙ্গাস বেড়ে ওঠার জন্য খুবই উপযুক্ত। ত্বকে ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বোধকল্পে তাই ব্যবস্থা নিতে হবে। আর্দ্র আবহাওয়া ও অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের কারণে ফাঙ্গাসজনিত সংক্রমণের ঘটনা অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে প্রায় ১০ গুণ বেশি। আর এ ফাঙ্গাস সংক্রমণের ঘটনা বর্ষার সময় বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ফাঙ্গাস আর্দ্র অথচ উষ্ণ এমন পরিবেশে সহজেই বেড়ে ওঠে। কাজেই বর্ষা ঋতুতে শরীর ঘেমে গেলেও বগল, অন্তর্বাসের ভেতরে, পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঙ্গাস দেখা দেয়।

ফাঙ্গাস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে দেখা দিতে পারে। অঙ্গভেদে এদের নামও ভিন্ন, যেমন অ্যাথলেটস ফুট, জক ইচ, ন্যাপি র‌্যাশ, শরীরের বিভিন্ন স্থানে রিং ওয়ার্ম ইত্যাদি। এ জাতীয় সব রোগেরই একটা সাধারণ উপসর্গ হচ্ছে শরীরে চুলকানির উদ্রেক। এই চুলকানির প্রবণতা বেশ তীব্র হয়ে থাকে যখন না চুলকালে আর ভালো লাগে না। বর্ষার ফাঙ্গাল ইনফেকশন সাধারণত শুরু হয় পায়ের আঙুল থেকে। ছোট্ট ফুসকুড়ি দিয়ে শুরু হয় উৎপত্তি, তারপর লাল হয়ে সেটা ছড়াতে থাকে। মাঝে মধ্যে পায়ের তালুতেও এ ধরনের ইনফেকশন দেখা দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পায়ের তালুর চামড়া ধূসর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময়ে তা মরা চামড়ায় পরিণত হয়।

ত্বকের এই ভেঙে যাওয়ায় সেখানে জীবাণু সংক্রমণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া নখেও ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ঘটে। তখন নখের গোড়া মোটা হয়ে ফুলে যায়, কখনো কখনো নখও মোটা হয়ে যায়। একবার পায়ে যদি ফাঙ্গাস ধরা পড়ে তবে বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকলে সেটা নখেও ছড়িয়ে যায়। এক পা থেকে অন্য পায়ে, পা থেকে হাতে। এক হাত থেকে অন্য হাতে এভাবে সারা শরীরে সেটা ছড়িয়ে যেতে পারে। আক্রান্ত স্থানে চুলকানির উদ্রেককারী ছোট্ট দানার মতো দেখা যায়, যা চুলকানোর পর সেখান থেকে কষ ঝরে।

এ ছাড়া গোলাকার আংটির মতো আকৃতির এক ধরনের ফাঙ্গাস রয়েছে। এগুলো শরীরের যেকোনো স্থানের ত্বকে রিংয়ের আকার নিয়ে আবির্ভূত হয়। আক্রান্ত স্থানটি খুব চুলকায় ও পরে সেখান থেকে কষ ঝরে। এ ধরনের ফাঙ্গাস কুঁচকিতে (জক ইচ) খুব বেশি দেখা যায়। যারা সিনথেটিক ও টাইট অন্তর্বাস পরেন, বর্ষার সময় তাদের ক্ষেত্রে কুঁচকিতে ফাঙ্গাস ইনফেকশন বেশি হয়। উল্লেখ্য, সাধারণের কাছে এই ফাঙ্গাস ইনফেকশন ‘দাদ’ বলে পরিচিত।

ফাঙ্গাস এড়াতে হলে শরীর শুষ্ক রাখতে হবে। কখনো ভেজা ভাব কিংবা ড্যাম্প কাপড় পরা যাবে না। কাপড় পুরোপুরি শুকনো হতে হবে, প্রয়োজনে ইস্ত্রি করে নেয়া ভালো। কুঁচকির ত্বক যাতে ভেজা না থাকে, সেখানে যেন আর্দ্রতা আটকে না যায় সে জন্য সিনথেটিকের অন্তর্বাস এড়িয়ে সুতির অন্তর্বাস ব্যবহার করতে হবে। মেয়েদের ব্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। তা না হলে ব্রেস্টের নিচের দিকে ফাঙ্গাস সংক্রমণ হতে পারে।

ডায়াবেটি রোগীদের ক্ষেত্রে ফাঙ্গাস সংক্রমণের ঘটনা বেশি ঘটে। কারণ রক্তে বাড়তি সুগারের উপস্থিতি ফাঙ্গাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়পার আঁকড়ে থাকা ত্বকের স্থানটিতে ফাঙ্গাস বেড়ে উঠতে পারে। সিনথেটিক ডায়পারের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঝুঁকি আরো বেশি। এ ছাড়া ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে শরীরের যেকোনো স্থানে ফাঙ্গাস সংক্রমণ ঘটতে পারে।

ফাঙ্গাসের চিকিৎসাপদ্ধতি

কখন কেমন
সংক্রমণের ব্যাপ্তি ও ধরনের ওপর নির্ভর করে ফাঙ্গাসের চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে সঠিক চিকিৎসায় যেকোনো ফাঙ্গাসই সারিয়ে তোলা সম্ভব। তবে সঠিক চিকিৎসায় যেকোনো ফাঙ্গাসই সারিয়ে তোলা সম্ভব। প্রথমত পরিচ্ছন্নতা ও শুষ্কতা অবলম্বন করার পরও ফাঙ্গাস সংক্রমণ ঘটে গেলে সে ক্ষেত্রে ত্বকের উপরিভাগে অ্যান্টিফাঙ্গাল মলম ব্যবহার, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সাসপেনশনধর্মী অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ সেবন করে ফাঙ্গাল ইনফেকশন থেকে সেরা ওঠা গেলেও ফাঙ্গাস বেড়ে ওঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ থেকে মুক্ত হতে না পারলে ফাঙ্গাসের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে ফাঙ্গাসের অনেক কার্যকর ওষুধ বাজারে এসেছে। এগুলো সেবনে শারীরিক প্রতিক্রিয়া খুবই কম, প্রতিদিন খেতেও হয় না।

ফাঙ্গাল ওষুধ সেবনের আগে লিভারের কোনো ত্রুটি আছে কি না তা পরখ করে নিতে হবে। তাই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গেলে চিকিৎসার আগে তিন-চার মাসের মধ্যে জন্ডিস হওয়ার ইতিহাস থাকলে তা ডাক্তারকে জানাতে হবে। অনেকেই ফাঙ্গাসকে খুব সহজ ব্যাপার মনে করে ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতার কথায় ওষুধ খেয়ে থাকেন। এটা ঠিক নয়, এতে বিপদ হতে পারে। তা ছাড়া ফাঙ্গাস নিরাময়ে ওষুধ প্রয়োগের আগে ফাঙ্গাসের ধরন সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে হবে। ফাঙ্গাস সংক্রমিত ত্বক চুলকানোর ফলে ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে ঘামের সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে আরো কিছু ওষুধ দিতে হয়। কাজেই ফাঙ্গাসের চিকিৎসা জটিলও হতে পারে। সুতরাং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়াই উত্তম। বিশেষজ্ঞ না পেলে একজন চর্মরোগ বিষয়ে অভিজ্ঞ এমবিবিএস চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।

ফাঙ্গাস থেকে দূরে থাকা যায় কিভাবে?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফাঙ্গাস সংক্রমণ প্রায় ১০০ ভাগ নিরাময় করা সম্ভব। তবে সেটা আবারো হতে পারে। কারণ ত্বকে ফাঙ্গাস বেড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি হলে সেখানে ফাঙ্গাস বেড়ে উঠতে চেষ্টা করবে। তাই ফাঙ্গাস প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে সেগুলো হচ্ছে পা, আঙুলের ফাঁক, নখের গোড়া ভালো করে সাবান দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

ধোয়ার পর শুষ্ক টাওয়েল দিয়ে ভেজা স্থান মুছে শুষ্ক করে ফেলতে হবে। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক, ঊরুসন্ধির ভাঁজ, বগল, ঘাড়, মাথার চুল ইত্যাদি পুরোপুরি শুকনো না করলে সেখানে ফাঙ্গাস বেড়ে উঠতে পারে।

Category: ত্বক