সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

প্রোস্টেট স্পেসিফিকেশন এন্টিজেন

উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন লোক যাদের পরিবারে প্রোস্টেট ক্যান্সার-এর ইতিহাস আছে তাদের ৪৫ বছর বয়স থেকেই পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত্। যাদের পরিবারে প্রস্টেট ক্যান্সার রোগীর ইতিহাস নেই এবং বাড়তি ঝুঁকিও নেই তাদের ৫০ বছর  থেকে পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত্।

প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের জন্য একটি নীরব ঘাতক রোগ হিসেবে সমস্ত পৃথিবীতে পরিচিত। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগ নির্ণয় করা অত্যান্ত জরুরি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগটি নির্ণয় করতে পারলে একে সারিয়ে তোলা সম্ভব। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে পিএসএ আবিষ্কারের পর হতে এ রোগ নির্ণয় এবং এর কার্যকর চিকিত্সা অনেক সহজ এবং নির্ভূল হয়েছে।

পি.এস.এ. কি

প্রোস্টেট গ্রন্থি হতে নিঃসৃত ছোট প্রোটিন জাতীয় পদার্থের নাম পিএসএ। পুরুষদের বীর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পরিমাণে থাকে এবং বীর্জ্যকে তরলীকরণ করাই এর কাজ। প্রোস্টেট গ্রন্থির অভ্যন্তরীণ আবরণের কারণে খুব সামান্য পরিমাণ পিএসএ রক্তে প্রবেশ করে যেটা স্বাভাবিক মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে নির্ণয় করা হয়।

স্বাভাবিক পিএসএ-এর পরিমাণ কত  ?

রক্তে স্বাভাবিক পিএসএ-এর পরিমাণ হলো ০-৪ ন্যানোগ্রাম/মিঃলিঃ। সম্প্র্রতি বয়স অনুযায়ী পিএসএ-এর স্বাভাবিক পরিমাণ নির্ণয় করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যেমন- বেশী বয়স্ক লোকদের ক্ষেত্রে পিএসএ’র পরিমাণটা বেশী হবে; অন্যদিকে অল্প বয়স্ক লোকদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ কম হবে। প্রস্টেট ক্যান্সারের উপস্থিতি সঠিকভাবে নিরূপণ করার জন্য স্বাভাবিক রক্তের পিএসএ-এর মাত্রা ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২.৫ ন্যানোগ্রাম/ মিঃলিঃ স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। তবে আমাদের দেশে প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রার্দুভাব খুব বেশী না হওয়ায় আমাদের দেশের বেশীর ভাগ চিকিত্সকগণ ০-৪ ন্যানোগ্রাম/মিঃলিঃ কে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন।

উচ্চমাত্রার পিএসএ-তে কি বুঝায় ?

উচ্চমাত্রার পিএসএ মানেই যে রোগী প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছেন তা নয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যেহেতু প্রোস্টেট গ্রন্থির কোষ থেকে পিএসএ তৈরী হয়, সেহেতু বড় প্রোস্টেট (বিপিএইচ) গ্রন্থির কারণে পিএসএ-এর মাত্রা বাড়তে পারে। বড় প্রস্টেট বা BPH কিন্তু ক্যান্সার নয়। তবুও BPH-এ পিএসএ-এর মাত্রা কখনও কখনও অনেক বেশী হতে পারে। প্রোস্টেট গ্রন্থির যেকোন ধরণের জীবানু সংক্রমণ বা প্রদাহের (প্রোস্টেটাইটিস) কারণে প্রোস্টেট গ্রন্থির আভ্যন্তরিণ আবরণ ভেঙ্গে গিয়ে বেশী পরিমাণে পিএসএ রক্তে চলে আসতে পারে; যার কারণে পিএসএ-এর পরিমাণ রক্তে বেড়ে যেতে পারে।

এছাড়াও প্রস্টেট পরীক্ষা, মূত্রনালী যন্ত্রদ্ব্বারা পরীক্ষা করা বা প্রোস্টেট গ্রন্থি ম্যাসেজ করার কারণেও পিএসএ বাড়তে পারে। সুনির্দিষ্টভাবে পিএসএ-এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের প্রধান উদ্ব্বেগের কারণ এটা প্রোস্টেট ক্যান্সার কিনা। সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত দেশে ২.৫ ন্যানোগ্রাম মাত্রাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। এতে অধিক সংখ্যক ক্যান্সার রোগী সনাক্ত করা সম্ভব হয়। এটা মনে রাখতে হবে যে, পিএসএ-এর এই মাত্রার চেয়ে নীচের মাত্রাতেও প্রোস্টেট ক্যান্সার কখনও কখনও পাওয়া যায়।

বর্ধিত পিএসএ এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার

স্বাভাবিক প্রোস্টেট ক্যান্সার কোষে অল্প পরিমাণ পিএসএ থাকে; কিন্তু ক্যান্সার কোষগুলো বেশী পরিমাণে পিএসএ তৈরী করে এবং রক্তে ছেড়ে দেয়। এ কারণেই প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীদের পিএসএ-এর পরিমাণ বেশী থাকার সম্ভাবনা থাকে এবং এর পরিমাণ যতবেশী হবে ততই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা বেশী থাকবে। পিএসএ-এর মাত্রা বেশী হওয়ার অনেক কারণই থাকতে পারে যেমন- প্রস্টেট গ্রন্থের প্রদাহ, প্রস্টেট গ্রন্থির স্ফীতি ইত্যাদি কারণেও পিএসএ-এর মাত্রা বেশী হতে পারে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে যে, পিএসএ-এর মাত্রা স্বাভাবিক বা তার নীচে হলেও প্রস্টেট ক্যান্সারের উপস্থিতি প্রায় শতকরা ৩-১০ ভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।

পিএসএ-এর পরিমাণ বেড়ে গেলে কি করা উচিত ?

একজনের পিএসএ-এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া মানেই তার প্রোস্টেট ক্যান্সার আছে তা নয়। আলট্রাসাউন্ড যন্ত্রের মাধ্যমে প্রোস্টেট গ্রন্থির সূঁচ দ্ব্বারা মাংস পরীক্ষাই (Trans Rectal Ultrasound guided Biopsy prostate biopsy or RTUS biopsy) একমাত্র পরীক্ষা যার মাধ্যমে ক্যান্সারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। মলদ্ব্বারে আঙ্গুলের সাহায্যে প্রোস্টেট পরীক্ষায় প্রস্টেট গ্রন্থি স্বাভাবিক থাকলেও পিএসএ-এর মাত্রা বেশী হলে অবশ্যই একজন ইউরোলজিস্ট দ্ব্বারা  বিষয়টি  মূল্যায়ন করা উচিত। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন-পায়ু পথ দিয়ে প্রোস্টেট গ্রন্থির আলট্রাসাউন্ড, পায়ুপথ দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে প্রোস্টেট গ্রন্থির পরীক্ষা এবং পিএসএ-এর পরিমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নিবেন যে প্রোস্টেট গ্রন্থির বায়োপসির প্রয়োজন আছে কি না। সমস্যাটি সন্দেহজনক হলে অবশ্যই প্রস্টেটের সূঁচ বায়োপসি করা উচিত্।

সবারই কি নিয়মিত পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত্

এ মূহুর্তে এ সম্পর্কে কোন প্রচলিত সুপারিশ নেই এবং বিশ্বের বড় বড় চিকিত্সা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো-এ সম্পর্কে একমতে পৌঁছাতে পারেনি। উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন লোক যাদের পরিবারে প্রোস্টেট ক্যান্সার-এর ইতিহাস আছে তাদের ৪৫ বছর বয়স  থেকেই পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত্। এখনও এটা বিতর্কিত যে, যাদের পরিবারে প্রস্টেট ক্যান্সার রোগীর ইতিহাস নেই এবং বাড়তি ঝুঁকিও নেই তাদের ৫০ বছর  থেকে পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত্।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো একজন ইউরোলজিস্ট-এর সাথে আলোচনা করে এ ধরনের পরীক্ষা করা উচিত্ যাতে স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক ফলাফলের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া যায়। বর্তমানে সারা বিশ্ব জুড়ে এ বিষয়ের ওপর যে গবেষণা চলছে আমরা আশাবাদী যে তার মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট উত্তর অধুনাই আমাদের কাছে আসবে। উন্নত বিশ্বে প্রস্টেট ক্যান্সারের স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু আছে। এ প্রোগ্রাম অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে বেশীর ভাগ বিশেষজ্ঞরা একমত নন।

লেখক: প্রফেসর এম. এ. সালাম: প্রখ্যাত অনকো ইউরোলজিস্ট , সাবেক চেয়ারম্যান: ইউরোলজি বিভাগ

%d bloggers like this: