সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

প্রতিরোধ করুন মুখের ক্যান্সার

মাজেদা বেগমের মনটা খারাপ। মৃত্যুভয় তাকে তাড়া করছে। মুখের ঘাকে কেন যে গুরুত্ব দেননি সময়মত! যখন চিকিত্সকের শরণাপন্ন হলেন তখন সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন, এটি কোনো সাধারণ ঘা নয়। ক্যান্সার হয়ে গেছে। তাও এতো বড় আকার ধারণ করেছে যে, অপারেশনের অবস্থায় আর নেই। মুখের হা ছোট হয়ে গেছে, গলার কিছু গ্রন্থিতেও ছড়িয়ে গেছে। রেডিও থেরাপি বা কেমোথেরাপি দিয়ে আক্রান্ত স্থান ছোট করে আনতে পারলে পরে সার্জারি করা যেতেও পারে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ কয়েক সাইকল কেমোথেরাপি দেয়ার পরও তা আর অপারেশনের পর্যায়ে এলো না। এখন শুধু মৃত্যুর জন্য প্রহর গোনা…।

তার মন খারাপের আরও দুটি কারণ আছে।
এক. এ ক্যান্সারটি প্রতিরোধযোগ্য অথচ তিনি তা প্রতিরোধের চেষ্টা করেননি।
দুই. তার এ রোগটির কারণে তিনি একাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, অসচ্ছল পরিবারটিও পথে বসতে চলেছে।

এ ক্যান্সার কতটা সাধারণ?
মুখ গহ্বর ও জিহ্বায় কোষের কোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকায় এ ক্যান্সারে আক্রান্তের হার খুব বেশি নয়। দেহে যতরকমের ক্যান্সার হয় তার মাত্র ২-৩ শতাংশ হয় মুখের ক্যান্সার। মহিলাদের তুলনায় পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটা একটু অন্যরকম। এ দেশে সুনির্দিষ্ট ব্যাপক পরিসংখ্যান না থাকলেও কিছু পরিসংখ্যান ও পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, এখানে দেহের সব ক্যান্সারের মধ্যে ২৫-৩০ শতাংশ হলো মুখের ক্যান্সার। আর এ অঞ্চলে পুরুষের চেয়ে নারীদের মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকগুণ বেশি।

মুখের ক্যান্সার হওয়ার কারণ
বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে মুখের ক্যান্সার এতো ব্যাপকহারে হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ সাদাপাতা, জর্দা, গুল ইত্যাদি যাকে এক কথায় ধোঁয়াবিহীন তামাক বা ঝসড়শবষবংং ঞড়নধপপড় বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও বিড়ি-সিগারেট এবং মদ মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী। যাদের একসঙ্গে এ ধরনের একের অধিক বদঅভ্যাস আছে তাদের বেলায় মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকগুণ বেশি। হিউম্যান প্যাপিলোমা নামে এক ধরনের ভাইরাসও মুখের ক্যান্সার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। যাদের খাদ্য তালিকায় ফল ও শাক-সবজি কম থাকে তাদের বেলায়ও মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। মুখের ভেতর অসুস্থ ও তীক্ষষ্ট দাঁতের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা থেকেও মুখের ক্যান্সার হতে পারে।

মুখের ক্যান্সারের লক্ষণ

  • মুখ ও জিহ্বার কোনো অংশে ঘা যা সাধারণ চিকিত্সায় ভালো হয় না।
  • ক্ষতস্থানে ব্যথা বা সেখান থেকে রক্ত পড়া।
  • ঘাড়ে বা গলার কোনো অংশে চাকার মতো ফুলে ওঠা।
  • খেতে কষ্ট হওয়া।

এসব সমস্যা দেখা দিলেই যে ক্যান্সার হয়েছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে এ ধরনের কোনো লক্ষণ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই একজন চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া উচিত। ডাক্তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নির্ণয় করবেন এ সমস্যা ক্যান্সারের কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে।

চিকিত্সা
প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে মুখের ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। কখনও শুধু অপারেশন, কখনও শুধু রেডিওথেরাপি আবার কখনও এ দুটোর সমন্বয়ে মুখের ক্যান্সারের চিকিত্সা করা হয়ে থাকে। এছাড়া কখনও আবার কেমোথেরাপির সাহায্যও নেয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, যত তাড়াতাড়ি চিকিত্সা করা যাবে তত ভালো ফল পাওয়া যাবে।

প্রাথমিক অবস্থায় চিকিত্সা না করালে মুখের ক্যান্সার প্রথমে গলায় ও পরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন চিকিত্সা অত্যন্ত জটিল এমনকি অসম্ভবও হয়ে যায়।

প্রতিরোধের উপায়

  • শুধু পান, সাদা পাতা, জর্দা, গুল, বিড়ি-সিগারেট ও মদ জাতীয় দ্রব্য ত্যাগ করেই শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশি মুখের ক্যান্সার রোধ করা যায়।
  • মুখের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করুন।
  • খাদ্য তালিকায় নিয়মিত ফল ও শাক-সবজি জাতীয় খাবার রাখার চেষ্টা করুন।
  • মুখে কোনো ক্ষত দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে দ্রুত চিকিত্সকের পড়ামর্শ নিন।

মনে রাখবেন, মুখের ক্যান্সার অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতন ইচ্ছা।