সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

পেট না কেটে পিত্তথলির পাথর অপারেশন

অপারেশনের কথা শুনলেই আঁতকে উঠবে না এমন মানুষ বিরল। আর পেট কাটার কথা শুনলে তো ভয়ে যে কারোর শুকিয়ে যায় মুখ। আমাদের দেশে পিত্তথলিতে পাথর হওয়া সচরাচর দেখা যায়। এ ধরনের রোগের চিকিৎসা হলো অপারেশন করে পিত্তথলি ফেলে দেয়া।

আলোক প্রক্ষেপণের সাহায্যে যদিও পাথর গুঁড়ো করে দেয়া যায় কিন’ সম্ভাবনা থাকে আবার পাথর সৃষ্টির, তাই পিত্তথলি ফেলে দেয়াই এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম চিকিৎসা। কিন’ কিভাবে? এত দিন পেট কেটে সে ব্যবস’া চালু থাকলেও অনেকেই আমরা এখন পরিচিত হয়ে উঠেছি ল্যাপারোস্কপির সার্জারি নামক নতুন পদ্ধতিতে অর্থাৎ পেট না কেটে যন্ত্রের সাহায্যে পিত্তথলি অপসারণ করা যায়। ১৯৮৭ সালে একজন ফরাসি সার্জন পেট না কেটে ল্যাপারোস্কপির মেশিনের সাহায্যে পিত্তথলির অপারেশন শুরু করেন। অনেক চিকিৎসকের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও বর্তমানে পিত্তথলির অপারেশনে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি এটিই।

সাধারণ অপারেশনের মতো এ ক্ষেত্রে পেটে লম্বা দাগ সৃষ্টি হয় না। সৃষ্টি হয় না জটিলতার। স্রেফ রোগীকে অজ্ঞান করে পেটে চারটি ছিদ্র করে মেশিন ঢুকিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করা যায় অপারেশন। একটি ছিদ্র দিয়ে টেলিস্কোপ ঢুকিয়ে ক্যামেরার সাহায্যে পেটের ভেতরের পুরো চিত্রটিই টিভি স্ক্রিনে নিয়ে আসা হয়। সেটি দেখে দেখে সার্জন নিপুণ দক্ষতায় পিত্তথলিকে অপসারণ করে থাকেন।

এ পদ্ধতির সুবিধা কী?
এক. শরীরে কাটা দাগ না থাকা
কে চায় তার সুন্দর শরীরকে কাটাছেঁড়া করতে? সাধারণ অপারেশনে শরীরে লম্বা একটি স’ায়ী দাগ থেকেই যাবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে বিব্রতকর। কিন’ ল্যাপারোস্কপিতে দাগ থাকে না বললেই চলে।

দুই. সেলাই কাটার ভয় না থাকা
পেট কেটে পিত্তথলির অপারেশন করলে পেটে অন্তত ১০-১২টা সেলাই দিতে হয়, যা কাটার সময় রোগীর জন্য ভীতি সঞ্চার করে। রোগী মনে করে অপারেশনের পরে সেলাই একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন’ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারিতে সেলাই কাটার কোনো বালাই নেই অর্থাৎ যেহেতু রোগীর ত্বকে কোনো সেলাই দেয়া হয় না। তাই সেলাই কাটার প্রশ্নও ওঠে না।

তিন. ব্যথা কম হওয়া
সাধারণ অপারেশনের পর রোগীর ব্যথা থাকে প্রচুর। কারণ অপারেশনের সময় রোগীর পেটে বেশ টানাহেঁচড়া পড়ে, তা ছাড়া পেটে থাকে লম্বা বড় ক্ষত। কিন’ ল্যাপারোস্কপিতে এ রকম ঝামেলা নেই বলে ব্যথাও হয় খুব নগণ্য।

চার. তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস’ায় ফিরে আসা
সাধারণ অপারেশনে রোগী তিন মাসের আগে কোনো ভারি কাজ করতে পারে না। কিন’ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারিতে রোগী এক সপ্তাহের মধ্যে তার স্বাভাবিক কাজে ফিরে যেতে পারে। সাধারণ অপারেশনের কয়েকটি দিন রোগীকে না খেয়ে থাকতে হয়। কিন’ ল্যাপারোস্কপিতে রোগী ছয়-সাত ঘণ্টার মধ্যেই খাওয়া শুরু করতে পারে।

পাঁচ. হাসপাতালে কম সময় অবস’ান করা
পেট কেটে অপারেশন করতে হলে রোগীকে হাসপাতালে কমপক্ষে এক সপ্তাহের বেশি অবস’ান করতে হয়। এ সময়ে রোগী অন্য ব্যাধিতেও আক্রান্ত হতে পারে। কিন’ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারিতে রোগী দু-তিন দিন পরই বাড়ি চলে যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের খরচ ও কষ্ট অনেক কমে যায়।

ছয়. অপারেশন-পরবর্তী হার্নিয়া না হওয়া
পেট কেটে অপারেশন করলে ত্বকের কাটা জায়গায় হার্নিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন’ ল্যাপারোস্কপিতে সে ধরনের ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

সাত. ইনফেকশন বা সংক্রমণ কম হওয়া
পেট কেটে অপারেশন করলে ইনফেকশনের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। কারণ সেখানে চিকিৎসকের হাত, গজ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সংস্পর্শ লাগে। তা ছাড়া কাটা জায়গাটি বড় থাকে বলে বাইরের জীবাণু অসাবধানতাবশত সেখানে ঢুকে ইনফেকশন ঘটাতে পারে। কিন’ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারিতে এ ধরনের ঝুঁকি নেই বলে ইনফেকশনের সম্ভাবনাও কম থাকে।

কোন কোন ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি করা যাবে না?
সাধারণভাবে পিত্তথলিতে পাথর হলে ল্যাপারোস্কপিক যন্ত্রের সাহায্যে পিত্তথলি অপসারণ করা সম্ভব। কিন’ পাথর যদি পিত্তনালীতে ঢুকে পড়ে সে ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির চেষ্টা করা উচিত নয়। পিত্তথলিতে টিউমার বা ক্যান্সার হলেও এ পদ্ধতি প্রয়োগ না করাই শ্রেয়।

লেখক : ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল, আবাসিক সার্জন, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা