সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

পেটের মহাধমনী ফুলে যাওয়া

এবডোমিনাল এওর্টিক অ্যানিউরিজম কী?
এওর্টা, যাকে বলা হয় মহাধমনী, মানব দেহের সর্ববৃহত্ রক্তনালী যা হার্ট থেকে উত্পত্তি হয়ে হার্টের পেছন দিয়ে বক্ষ ক্রস করে ডায়াফ্রামের নির্দিষ্ট ছিদ্র দিয়ে পেটের অংশে আসে। পেটে নাভির লেভেলে এসে তা ‘ইলিয়াক’ আর্টারি নামে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। অবস্থানের কারণে এটির কয়েকটি নাম হয়। শুরুতে বলা হয় ঊর্ধ্বগামী মহাধমনী (Ascending Aorta), তারপর গেটের মতো দেখায় বলে Arch of the Aorta, বক্ষে অবস্থানের জন্য থোরাসিক এওর্টা ও পেটে অবস্থানের কারণে Abdominal Aorta। Abdominal Aorta প্রধানত কিডনি, অন্ত্র ও শরীরের নিচের অংশে শোধিত রক্ত সরবরাহ করে।

ইলিয়াক আর্টারি তলপেট ও দুই পায়ে রক্ত সরবরাহ করে। যখন পেটের মহাধমনীর কোনো অংশ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আকারে ফুলে যায় তখন তাকে বলে Abdominal Aortic Aneurysm (AAA)। মহাধমনীর দেয়ালে যখন কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় তখন তার নিজস্ব উচ্চ প্রেসার ধমনীকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে দেয়। একজন বয়স্ক মানুষের মহাধমনীর ব্যস ১ ইঞ্চির মতো (২ সেমি)। কিন্তু Aneurysm হলে এই আকার নিরাপদ মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন ঝুঁকি হলো মহাধমনী ফেটে যাওয়া। হঠাত্ ফেটে গেলে পেটে-পিঠে তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, শক, অজ্ঞান হওয়া ও মৃত্যু হতে পারে। কখনও কখনও ফুলা-ফাঁপা অংশে জমাট বাঁধা রক্ত (Thrombus) ছুটে গিয়ে পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়। যা কিনা একটি জরুরি পরিস্থিতি।

বাংলাদেশে বছরে এই রোগে কত রোগী ধরা পড়ে তার পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ২ লাখ লোকের এই রোগ শনাক্ত হয়, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি থেকে যায় অপারেশন করার আগ পর্যন্ত। সুসংবাদ হলো, যদি এই সমস্যা সময়মত ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আগে নির্ণয় করা যায় তবে যথাযথ চিকিত্সার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। বাংলাদেশে এখন এই রোগের চিকিত্সা ও অপারেশন নিয়মিত হচ্ছে।

রোগের লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে Abdominal Aortic Aneurysm (AAA) থাকলেও কোনো রোগীর তেমন কোনো উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। তবে এক পর্যায়ে :
— পেটে (বাম পাশে) চাকা অনুভূত হবে, হাত দিলে মনে হবে লাফায়।
— হঠাত্ পেটে-পিঠে তীব্র ব্যথা হবে, এই অবস্থায় বুঝতে হবে সমস্যাটা ফেটে যাওয়ায় পর্যায়ে পৌঁছেছে অথবা ফাটা শুরু হয়েছে।
— কখনও পায়ের আঙুলের তীব্র ব্যথা, যন্ত্রণা, কালো হওয়া অথবা পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে।
— ফেটে গেলে তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরানো এমনকি অজ্ঞান হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। যা একটি জীবননাশী অবস্থা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যু হতে পারে।

Abdominal Aortic Aneurysm (AAA) কেন হয়?
পুরোপুরি কারণ জানা এখনও গবেষণার বিষয়। তবে ধারণা করা হয়, মহাধমনীর দেয়ালে প্রদাহ (inflamation) থেকে তার দেয়াল দুর্বল হয়ে গিয়ে এমনটি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে নালীতে চর্বি জমাট (Atherosclerosis) জনিত সমস্যা থেকে এটা হতে পারে। তবে বংশগত কারণে কারও কারও মহাধমনীর দেয়াল পাতলা হয়ে যেতে পারে। আর মহাধমনীর উচ্চ রক্তচাপ তো আছেই। সেদিক থেকে একাধিক কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। দুর্ঘটনা ও অপারেশনজনিত আঘাত থেকেও হওয়ার ইতিহাস আছে।

যারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ তারা হলো :
১. ষাটোর্ধ্ব পুরুষ।
২. বংশগত, মা-বাবা অথবা ভাই-বোনের এই রোগ থাকলে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে।
৪. ধূমপানেরও যোগসূত্র আছে। এই রোগ মহিলাদের চেয়ে পুরুষের বেশি হয়।

কী পরীক্ষা করতে হবে
যাদের এই রোগের লক্ষণ স্পষ্ট নয় তাদের বেলায় অন্য কোনো সমস্যার কারণে যখন ডাক্তাররা পেটের পরীক্ষার জন্য পাঠান তখন হঠাত্ করেই এই রোগ ধরা পড়ে। যেমন : আলট্রাসাউন্ড, সিটিস্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি। এনজিওগ্রাম করে হার্টের অবস্থাসহ সার্বিক ধারণা পাওয়া যায়।

রোগের চিকিত্সা
সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও অপেক্ষাকরণ। এনিউরিজম বিপজ্জনক পর্যায়ে না থাকলে সতর্ক পর্যবেক্ষণ করা যায়। বছরে ২/১ বার আলট্রাসাউন্ড অথবা সিটিস্ক্যান করে এর সাইজ সম্পর্কে জানা যায়। যদি সাইজে ২ ইঞ্চির কম থাকে (5-5.5cm) তার বেলায় এটি প্রযোজ্য। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস অবশ্যই কন্ট্রোলে রাখতে হবে। পেটে যেন আঘাত না লাগে তা খেয়াল রাখতে হবে। ধূমপান ছাড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, এই সমস্যা নিজে নিজে চলে যাবে না। ডাক্তারের সঙ্গে মাঝে মাঝে আপনার সমস্যার কথা জানিয়ে কর্তব্য ঠিক করতে হবে। নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটা অবশ্যই একদিন ফেটে যেতে পারে!

ওপেন অপারেশন করে এই রোগ সারিয়ে তোলা যায়, কেবল একজন দক্ষ ভাসকুলার সার্জনই এই অপারেশন করতে পারেন। অপারেশনের মাধ্যমে ফুলা/দুর্বল মহাধমনী পুরোপুরি আলাদা করে উপরে ও নিচে ভালো অংশ রক্ষা করে মাঝখানের অংশটি কেটে বাদ দিতে হবে এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি Vascular Graft দ্বারা এই অংশ প্রতিস্থাপিত করে রক্ত চলাচল অব্যাহত রাখতে হবে। সম্পূর্ণ সেরে উঠতে ৭-১০ দিন লাগতে পারে। ভালো সেন্টারে এই অপারেশনের খরচ গ্রাফটসহ বড়জোর দুই লাখের মতো। বিদেশে ৭-৮ লাখের বেশি। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এন্ডোভাসকুলার গ্রাফটের মাধ্যমে এর চিকিত্সা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও এই প্রযুক্তি চালু হয়নি। তবে একদিন হবে ইনশাআল্লাহ।