সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে পাইলস চিকিত্সা

পাইলস রোগটি হাজার বছর ধরে পরিচিত। খুব কম লোকই আছেন যারা এ রোগের নাম জানেন না। পাইলস হচ্ছে মলদ্বারের ভেতরে ফুলে ওঠা শিরাযুক্ত মাংসপিণ্ড বা ভাসকুলার কুশন। সব মানুষেরই এই ‘কুশন’ আছে যা কি-না মল ত্যাগের সময় মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যখন এটি কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে তখনই আমরা বলি পাইলস বা হিমোরয়েড। গ্রামবাংলায় বলে গেজ রোগ। পাইলস শব্দটির প্রচলন হয় ১৩৭০ সাল থেকে, এর উত্পত্তি লাতিন শব্দ চরষধ থেকে যার অর্থ Balls বা পিণ্ড। পাইলসের আর একটি পুরনো নাম হচ্ছে হিমোরয়েড, যার উত্পত্তি গ্রিক শব্দ Haema বা রক্ত এবং Rhoos বা প্রবাহিত। এই শব্দটির উত্পত্তির ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। হিপোক্রেটস প্রথম এই নামটি ব্যবহার করেন। নাম দেখেই এই রোগের প্রধান উপসর্গগুলো অনুমান করা যায়।

উপসর্গগুলো কী কী?
পাইলসের প্রধান দুটি উপসর্গ হচ্ছে :

১. মলদ্বার থেকে তাজা রক্ত যাওয়া। ২. মলদ্বারের বাইরে মাংসপিণ্ড ঝুলে পড়া। এছাড়াও অন্য উপসর্গগুলো হচ্ছে—ক. মলদ্বারে চুলকানো। খ. মলদ্বার থেকে মিউকাস বা আম নিশ্রিত হওয়া। গ. মলদ্বারে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া।

পাইলসের কারণ ও শ্রেণীবিন্যাস
পাইলসের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়খানায় অতিরিক্ত কোত বা অনিয়মিত মল ত্যাগের অভ্যাস, ডায়রিয়া, গর্ভাবস্থা, কম আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ ইত্যাদি।

পাইলসকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়
ক) বহিস্থিত পাইলস : এ ক্ষেত্রে ফোলাটি থাকে মলদ্বারের বাইরে।
খ) অভ্যন্তরীণ পাইলস : এ ক্ষেত্রে ফোলাটি সাধারণত মলদ্বারের ভেতর থাকে। কিন্তু বাইরেও ঝুলে পড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ পাইলসকে আবার বিভিন্ন ডিগ্রি অনুযায়ী ভাগ করা যায়। যেমন—
১. প্রথম ডিগ্রি পাইলস : পাইলস সব সময় মলদ্বারের ভেতরে থাকে।
২. দ্বিতীয় ডিগ্রি পাইলস : পাইলসটি বাইরে ঝুলে পড়ে কিন্তু আপনাআপনি ভেতরে চলে যায়।
৩. তৃতীয় ডিগ্রি পাইলস : পাইলসটি বাইরে ঝুলে থাকে কিন্তু হাত দিয়ে চাপ দিলে ভেতরে ঢুকে যায়।
৪. চতুর্থ ডিগ্রি পাইলস : পাইলসটি বাইরে ঝুলে পড়ে কিন্তু সহজে ভেতরে ঢুকানো যায় না।

পাইলসের চিকিত্সা
পাইলসের চিকিত্সার প্রচলন বহু আগ থেকেই। ২৫ খ্রিস্টপূর্বে পাইলসের লাইগেশন পদ্ধতির বর্ণনা দেন ক্যালসাস নামে এক রোমান চিকিত্সক। ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক সভ্যতার সময় পাইলস-এর চিকিত্সায় রাবার ব্যান্ড পদ্ধতির মতো লাইগেশনের বর্ণনা পাওয়া যায় Hippocrates-এর চিকিত্সা বিজ্ঞানের বইয়ে।
যাই হোক, পাইলসের যে কোনো চিকিত্সার আগে সিগময়ডোসকপি বা কলোনোস্কপি করে জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার একমাত্র কারণ পাইলস, না অন্যকিছু। এটি নিশ্চিত হওয়ার পরই চিকিত্সা করা যুক্তিযুক্ত।

পাইলসের চিকিত্সা বিভিন্ন পদ্ধতিতে করা সম্ভব। যেমন—
— মলদ্বার না কেটে বা বিনা অপারেশনে। মলদ্বার কেটে বা অপারেশনের মাধ্যমে।
মলদ্বার না কেটে বা বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিত্সার মধ্যে একটি হচ্ছে এই ব্যান্ডিং বা রিং-লাইগেশন পদ্ধতি। আরেকটি হচ্ছে—ইনজেকশন পদ্ধতি। অপরদিকে অপারেশন পদ্ধতিতে মলদ্বারের চতুর্দিকে তিনটি জায়গায় কেটে পাইলসের চিকিত্সা করা হয়। অতি সম্প্রতি স্বয়ংক্রিয় আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে মলদ্বারের অনেক গভীরে কেটে পাইলস অপারেশন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে, যাতে মলদ্বারে কোনো ক্ষত থাকে না। এ পদ্ধতির নাম Longo বা Stapled Haemorrhoidectomy|

অত্যাধুনিক ব্যান্ডিং পদ্ধতি
১৯৬৩ সালে জে ব্যারন বহির্বিভাগ পদ্ধতি হিসেবে পাইলসের ব্যান্ডিংয়ের প্রচলন করেন। এই পদ্ধতিতে একটি চিমটার সাহায্যে পাইলসকে টেনে ধরে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে পাইলসের মাংসপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় এবং পাইলসের ফুলা মাংসপিণ্ডটি কুচকে যায়। এই পদ্ধতিতে মলদ্বারে কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই পাইলসের চিকিত্সা করা সম্ভব। রোগীকে অবশ বা অজ্ঞান করার প্রয়োজন হয় না এবং কোনো পূর্বপ্রস্তুতির দরকার নেই। চিকিত্সা শেষে রোগী হেঁটে বাড়ি চলে যেতে পারেন।

সময়ের বিবর্তনে এখন অনেক উন্নত অত্যাধুনিক ব্যান্ড লাগানোর যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ঝঁপঃরড়হ নধহফরহম অন্যতম। এ যন্ত্রের সাহায্যে সেকশন-এর মাধ্যমে টিস্যু টেনে ধরা হয় এবং ব্যান্ড পরিয়ে দেয়া হয়।

অতি সম্প্রতি আরেকটি অত্যাধুনিক ব্যান্ড লাগানোর যন্ত্র বেরিয়েছে যাতে আগে থেকেই যন্ত্রে ব্যান্ড পরানো থাকে। যন্ত্রটি সাকশন মেশিনের সঙ্গে যুক্ত করে শুধু ট্রিগার টিপলেই ব্যান্ডটি নির্দিষ্ট স্থানে লেগে যায়।
এই যন্ত্রটি অত্যন্ত আধুনিক এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে সফলতা প্রায় ৯৭ ভাগ। এই যন্ত্রের বিশেষত্ব হলো অল্প সময়ে এবং কম লোকবলে ব্যান্ডিং সম্পন্ন করা যায়। লেখক বিগত ১০ বছরে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক হিসেবে চাকরিকালীন সময়ে অনেক পাইলস রোগীর ক্ষেত্রে এই ব্যান্ডিং পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। তার অভিজ্ঞতায় এই চিকিত্সায় সফলতা আশাতীত। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে একমাত্র এই লেখকই এই যন্ত্রের সাহায্যে পাইলসের চিকিত্সা করে থাকেন।

কাদের জন্য ব্যান্ডিং প্রযোজ্য?
সব ধরনের পাইলস রোগীর ক্ষেত্রে ব্যান্ডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। তবে প্রথম, দ্বিতীয় ও কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় ডিগ্রি পাইলসে এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয়। যেসব রোগী রাবার এলার্জি বা রক্ত জমাট রোধের চিকিত্সা নিচ্ছেন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন তাদের এই চিকিত্সা দেয়া নিষেধ।

চিকিত্সা-পরবর্তী উপদেশ
ব্যান্ডিংয়ের পর পায়খানার সঙ্গে অল্প রক্ত যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই চিকিত্সার পর কয়েক সপ্তাহ পায়খানা নরম হওয়ার জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য পরিহার করতে হবে।

জটিলতা
এই পদ্ধতিতে জটিলতার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে সঠিকভাবে ব্যান্ড প্রয়োগ না করলে ব্যান্ড খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি ব্যান্ড খুব নিচে প্রয়োগ করা হয় তবে মলদ্বারে ব্যথা হতে পারে। তাই দক্ষ হাতে এটির প্রয়োগ হলে কোনো ধরনের জটিলতার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

লেখক : ডা. হাছান ইমাম আল হাদী, সহযোগী অধ্যাপক; কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ