সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

নীরব ঘাতক অসংক্রামক ব্যাধি

বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় উন্নতির ফলে চিকিত্সা বিজ্ঞানেরও অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্ত, যক্ষ্মা, হাম এবং বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি সহজেই চিকিত্সাতে নিরাময় ও প্রতিরোধযোগ্য। এসব রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। সারাবিশ্ব শুধু সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে ব্যস্ত। অনেক সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত নিরাময় করা সম্ভব আধুনিক চিকিত্সার কল্যাণে।

চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে নিরাপদ পানি, খাদ্য সরবরাহ, চিকিত্সা পদ্ধতি, কার্যকরী টিকা কর্মসূচি, সর্বোপরি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে সংক্রামক ব্যাধি কমে যাচ্ছে, মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বয়সের কারণে বার্ধক্যজনিত রোগ যেমন—অস্টিওপরোসিস, অস্টিওআর্থ্রোসিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি বাড়ছে এবং হয়ে উঠছে বড় ঘাতক।

দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ
কিন্তু সারা বিশ্বে অসংক্রামক ব্যাধি নীরব ঘাতকের মতো ধেয়ে আসছে এবং এসব ব্যাধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক রোগ ধীরে ধীরে কমছে, দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ এবং জনস্বাস্থ্য সমস্যায় বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। মানুষের পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনীতির ওপর প্রভাব ও চাপ পড়তে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সংক্রামক ব্যাধি থেকে অসংক্রামক ব্যাধির ব্যাপকতা অনেক বেড়ে গেছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৬০ ভাগের জন্য দায়ী অসংক্রামক ব্যাধি। যার মধ্যে ৮০ ভাগ মৃত্যু হয় এদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশে। আগে ধারণা করা হতো, অসংক্রামক ব্যাধি শুধু ধনী দেশে বসবাসকারীদের এবং বয়স্ক লোকের হয়। প্রকৃতপক্ষে এ রোগে আক্রান্তদের অর্ধেক কমবয়সী এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ৬১ ভাগ আক্রান্ত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর শতকরা ২৭.৩ ভাগ হয় বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগের কারণে। এদেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৬১ ভাগ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণের মধ্যে ৫টি হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। এসব রোগ হচ্ছে কিডনি, ক্যান্সার, ফুসফুস ও লিভার প্রদাহ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস প্রভৃতি।

২০০৫ সালে সারা বিশ্বের ৫.৮ কোটি লোকের মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৩.৫ কোটি লোকের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে অসংক্রামক রোগ, যা সংক্রামক রোগের মৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যু এবং অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর যোগফলের দ্বিগুণ বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদেশে মৃত্যুর শতকরা ১২.৫ ভাগ মৃত্যু হয় হৃদরোগে এবং ৬.২ ভাগ মৃত্যু ডায়াবেটিসের কারণে। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর হার শতকরা ২ ভাগ। প্রায় ১০.৩ লাখ লোক বর্তমানে স্ট্রোকে বা এর জটিলতায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে ৮.৯ ভাগ স্ট্রোকে আক্রান্ত।

অর্থনীতির ওপর চরম প্রভাব পড়ছে
বর্তমানে দেশে অসংক্রামক রোগের শতকরা ১৭.৯ ভাগ উচ্চ রক্তচাপ, ৩.৭ ভাগ ক্যান্সার, ৩ ভাগ অ্যাজমায়, ডায়াবেটিসে ৩.৯ ভাগ ও ২.৪ ভাগ ভুগছে স্ট্রোকে। শ্বাসতন্ত্রে বাধাজনিত রোগে মোট জনগোষ্ঠীর ৩ ভাগ ও হাসপাতালে ভর্তিকৃতদের মধ্যে ১৯ ভাগ এ রোগে আক্রান্ত। ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষের ৪৯ হাজার মুখগহ্বরের ক্যান্সার, ৭১ হাজার ল্যারেনজিয়াল ক্যান্সার ও ১ লাখ ৯৬ হাজার ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সূত্রে জানা যায়।

২০১০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, যেভাবে অসংক্রামক ব্যাধি বেড়ে চলেছে, তাতে অর্থনীতির ওপর চরম প্রভাব পড়ছে। এসব রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই রোগের ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। কারণ এই রোগে আক্রান্তরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগে।

অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ
সংক্রামক রোগ ধীরে ধীরে কমছে। আর দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ। আর্থিক অসচ্ছলতা, অশিক্ষা এবং চিকিত্সার অপ্রতুলতা এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। এসব রোগের চিকিত্সা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ করার বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক অস্থিরতা, খাদ্যাভ্যাস, যান্ত্রিক জীবন সবকিছু মিলিয়েই অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির জন্য দায়ী।

কিছু কারণ যেমন—
— কায়িক শ্রম ও ব্যায়াম না করা।
— অলস জীবন যাপন করা, স্থূলতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া।
— ধূমপান, তামাক পাতা, জর্দা, মাদক সেবন।
— অতিরিক্ত টেনশন, মানসিক চাপ।
— খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শাকসবজি, ফলমূল কম খাওয়া, অধিক ক্যালরিসমৃদ্ধ ও অধিক চর্বি-শর্করাজাতীয় খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ।
— খেলার মাঠের অভাব, বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা বা খেলাধুলার সংস্কৃতির বিলোপ, টেলিভিশন আর কম্পিউটার গেম ও ফেসবুক।
— গাড়ি-লিফট-চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের প্রবণতা।
— খাদ্যে কেমিক্যাল ও ভেজাল।
— জলবায়ু দূষণ।

প্রতিরোধের উপায়
অসংক্রামক রোগ আজ মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিকার ও প্রতিরোধযোগ্য। রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ব্যাপারে বেশি যত্নবান হতে হবে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে—
— মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে। নিয়মিত বিশ্রাম, সময় মতো ঘুমানো, নিজের শখের কাজ করা, নিজ ধর্মের চর্চা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি বেশি হবে।
— কায়িক শ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। বাড়তি ওজন কমাতে হবে।
— ধূমপান, মদ্যপান, মাদকদ্রব্য, তামাক পাতা ও জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
— খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা : কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। লবণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তরকারিতে প্রয়োজনীয় লবণের বাইরে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে।
— শিক্ষা ও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। এসব রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

ডা. এবিএম আবদুল্লাহ ডিন, মেডিসিন অনুষদ অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।