সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

নবজাতকের পরিচর্যা

জন্মের পর মুহূর্ত থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত বয়সের শিশু, যাদের নবজাতক বলা হয়ে থাকে,  তারা বাংলাদেশে প্রতি সাড়ে তিন মিনিটে একজন করে মারা যাচ্ছে। এর পেছনের কারণ অনেক।

নিউমোনিয়া, সেপসিস, ডায়রিয়া, ধনুষ্টঙ্কার প্রভৃতি সংক্রমণ, প্রসবকালীন জটিলতা আর যথাসময়ের আগেই প্রসব হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণ তো আছেই আর তার সাথে যোগ করা যায় আরো বিশেষ কিছু কারণ। যে দেশে এখনো শতকরা প্রায় ৯০ জন গর্ভবতী সন্তান প্রসব করেন বাড়িতে সে দেশে জনগণের মাঝে প্রসবের পদ্ধতি এবং নবজাতকের যতœ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এই ৯০ ভাগের মধ্যে আবার শতকরা ৮৪ ভাগ নারীই সন্তান প্রসব করেন প্রশিক্ষণহীন, অদক্ষ বা হাতুড়ে দাইয়ের কাছে। জন্মের পর পর নবজাতকের পরিচর্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। নবজাতককে পরিষ্কার করে তাকে কাপড়ে মুড়িয়ে এবং মায়ের কাছে দিয়ে উষ্ণ রাখা, পরিষ্কার ব্লেড দিয়ে নাড়ি কাটা ইত্যাদি কাজগুলো করা হয় খুব কম ক্ষেত্রেই।

নবজাতককে শালদুধ দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা আজকাল খুব বলা হচ্ছে চারদিকে। কিন্তু কাজ হচ্ছে কতটুকু? বাংলাদেশে মাত্র ১৩ শতাংশ নবজাতকের সৌভাগ্য হয় জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ার। বাকিদের কপালে কী জোটে? এখনো এ দেশে নবজাতকের মুখে সর্বপ্রথম খাবার হিসেবে মধু, চিনি, মিছরির পানি এমনকি সরিষার তেল পর্যন্ত দেয়া হয়। জন্মের পর পরই গোসল করানো একটা সাধারণ রেওয়াজ এ দেশে। অথচ জন্মের পর ২৪ ঘণ্টার আগে নবজাতককে গোসল করালে তার নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রীতিনীতি, কুসংস্কার এবং অন্ধ বিশ্বাসের ফলে একেক জায়গায় একেক নিয়ম মানা হচ্ছে, যার প্রায় সবই নবজাতকের জীবনের প্রতি হুমকিস্বরূপ। 

আসুন দেখে নিই জন্মের পর পর নবজাতকের যতœ নিতে কী কী করা উচিত :

নবজাতক গর্ভ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে গর্ভফুল বের হোক বা না হোক তার শরীর পরিষ্কার শুকনো কাপড় দিয়ে ভালোভাবে মুছে ভেজা কাপড় ফেলে দিতে হবে। তারপর নবজাতককে শুকনো পরিষ্কার কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে মায়ের পেটের ওপর বা পাশে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গর্ভফুল পড়ার অপেক্ষায় কোনোভাবেই বসে থাকা চলবে না এবং এরপর বিন্দুমাত্র দেরি না করে নবজাতককে মায়ের দুধ (শালদুধ) দিতে হবে।

সন্তান জন্মের পর পরই নাভি কাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। প্রথমে জীবাণুমুক্ত সুতা দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী বাঁধন দেয়া ও পরে জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার নতুন ব্লেড দিয়ে নাভি কাটাই হচ্ছে নিয়ম। নাভি সঠিক নিয়মে না কাটলে নাভিতে টিটেনাস থেকে শুরু করে নানা ধরনের সংক্রমণ হয়ে নবজাতকের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। নবজাতক শিশুকে প্রথম তিন দিনের মধ্যে গোসল করানো উচিত নয়। তিন দিন পরে গোসল করাতে হলে হালকা গরম পানি ব্যবহার করতে হবে।

জন্মের পর নবজাতক শ্বাস না নিলে আমরা অনেক সময় ভুল কিছু কাজ করে থাকি যেগুলো করা একেবারেই উচিত নয়। দেখা যাক সেগুলো কী কী। জন্মের পর নবজাতক শ্বাস না নিলে আমরা অনেকেই মনে করি পা ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে তার পিঠে থাপ্পড় দিলে কাজ হবে, কিন্তু সেটা করা আসলে নবজাতকের জন্য ক্ষতিকর। নবজাতকের মুখে অথবা শরীরে ঠাণ্ডা পানি ছিটানো, কানে বা নাকে ফুঁ দেয়া, নবজাতককে গরম বা ঠাণ্ডা পানিতে চুবানো, বুকের খাঁচায় চাপ দেয়া, গর্ভফুল গরম করা ইত্যাদি করা যাবে না। এগুলো করলে নবজাতকের উপকার না হয়ে ক্ষতি হবে বেশি। এ দেশে প্রতি সাড়ে তিন মিনিটে একটি নবজাতক মারা গেলে এই হিসাবে বছরে প্রায় দেড় লক্ষাধিক নবজাতক প্রাণ হারাচ্ছে। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে তবে সবই মোকাবেলা করা সম্ভব অতি সহজে। নবজাতকের সুরক্ষার জন্য কোনো ব্যয়বহুল সরঞ্জাম, উপকরণ ইত্যাদি কিছুরই প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু সচেতনতা। একমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই আমাদের দেশের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা, কুসংস্কার, ক্ষতিকর অভ্যাস ইত্যাদি দূর করা সম্ভব যা হবে নবজাতকের জীবন রক্ষায় সহায়ক।

এই রকম সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চললে আমাদের দেশের অসংখ্য নবজাতকের জীবন রক্ষা পেতে পারে। জন্মের পর পর নবজাতকের যথাযথ পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আরো অধিকসংখ্যক শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নবজাতকের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।

Category: শিশু