সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

থাইরয়েড সমস্যা

ক্লান্তি কি দিনের পর দিন টেনে নামাচ্ছে,  মগজে কেমন কুয়াশা, ওজন বাড়ছে, শীত শীত ভাব, কেশ হানি হচ্ছে। আবার বিপরীতও হতে পারে। উত্তেজিত, খুব ঘুম হচ্ছে, আবার উদ্বিগ্নভাব সব সময়। দোষী হতে পারে দেহের একটি গ্রন্থি; থাইরয়েড গ্রন্থি। শরীর ও মনের নিয়ন্ত্রক এই গ্রন্থিটি সময় সময় বেশ গোলমেলে কাজ করতে থাকে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। সঠিক চিকিত্সা হলে ভালো। গুরুতর সমস্যা এড়ানো যায়।

গলার সামনের দিকে বসে আছে প্রজাপতি আকৃতি এই থাইরয়েড গ্লান্ড। এ থেকে যে হরমোন নি:সৃত হয় তা নিয়ন্ত্রণ করে দেহের বিপাক কর্ম। বিপাক ব্যবস্থা শরীরকে এনার্জি ব্যবহারে সাহায্য করে। থাইরয়েড বিকল হলে বিপাক ধীর হতে পারে যা উদ্দীপ্ত হতে পারে এর কোনও একটি। হরমোন মান খুব কম বা খুব বেশী হলে নানা উপসর্গ হতে পারে।

ওজন বৃদ্ধি বা ওজন হানি

থাইরয়েড বৈকল্যের সবচেয়ে সচরাচর উপসর্গ হলো শরীরের ওজন পরিবর্তন, যার ব্যাখ্যা সহসা পাওয়া যায়না। ওজন খুব বেড়ে গেলে বোঝা যায় থাইরয়েড হরমোন এর মান বেশ কমে এসেছে, একে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোথাইরয়েডিজম’। অপরপক্ষে থাইরয়েড যদি শরীরের চাহিদার অতিরিক্ত হরমোন নি:স্বরণ করতে থাকে তখন শরীর হারাতে থাকে ওজন অপ্রত্যাশিতভাবে। একে বলে ‘হাইপারথাইরয়েডিজম’ বেশ সচরাচর।

গলায় স্ফীতি

গলায় স্ফীতি থাকলে একটি দৃশ্যমান ক্লু থাকলো যে থাইরয়েডে কোনও গন্ডগোল আছে। একে বলে গলগন্ড বা গয়টার। হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম দুটোর ক্ষেত্রে গলায় স্ফীতি হতে পারে। কখনও গলায় স্ফীতি হতে পারে থাইরয়েড ক্যান্সার বা নডুল থেকে থাইরয়েডের ভেতরে স্ফীতি। আবার থাইরয়েডের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন কারণেও গলায় স্ফীতি হতে পারে।

হূদঘাত হারে পরিবর্তন

থাইরয়েড হরমোন প্রভাব ফেলে প্রায় সমস্ত দেহযন্ত্রে এবং প্রভাব বেশ ফেলে হূদস্পন্দন হারের উপরও। যাদের থাইরয়েড গ্রন্থির ক্রিয়া লঘুতালে চলে (হাইপোথাইরয়েডিজম) তারা লক্ষ্য করে দেখবেন, তাদের হূদঘাত হার স্বাভাবিক থেকে ধীরগতি। আবার থাইরয়েডক্রিয়া বেশি হলে (হাইপারথাইরয়েডিজম) হূদযন্ত্র চলে দ্রুতহারে। বেড়ে যায় রক্তচাপ, ধুকপুক করতে থাকে হূদযন্ত্র।

পরিবর্তন দেহের বলশক্তি ও মন মেজাজে

থাইরয়েডযন্ত্র লঘুতালে চললে খুব ক্লান্তি লাগে, শ্লথ হয়ে যায় শরীর, বিষন্নতায় আচ্ছন্ন করে পুরো শরীর ও মনকে। থাইরয়েডক্রিয়া বেড়ে গেলে উদ্বেগ বাড়ে, ঘুমের সমস্যা হয়, মন হয় অস্থির ও উত্তেজিত।

কেশ হানি

থাইরয়েড হরমোনে সমতা নেই, যখন তখন একটি লক্ষণ হতে পারে কেশ হানি। হাইপো ও হাইপারথাইরয়েডিজম দুক্ষেত্রেই হতে পারে কেশ হানি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড বৈকল্য নিরাময় হলে কেশ গজানো আবার শুরু হতে পারে।

খুব বেশি শীতল বা উষ্ণ অনুভব

থাইরয়েড বিকল হলে দেহতাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিশৃঙ্খল হয়ে যেতে পারে। থাইরয়েড ক্রিয়ালঘু হলে শীতল বোধ হয় শরীর। থাইরয়েড ক্রিয়া অতিরিক্ত হলে বিপরীত হয় প্রতিক্রিয়া। ঘাম নি:সরণ যায় বেড়ে। উত্তাপের প্রতি বিরাগ জন্মে।

থাইরয়েড লঘুক্রিয়া ও অন্যান্য উপসর্গ

  • শুষ্ক ত্বক এবং ভঙ্গুর নখ
  • হাতে অবশ বোধ ও ঝিন ঝিন অনুভূতি
  • কোষ্টবদ্ধতা
  • অস্বাভাবিক ঋতুস্রাব

থাইরয়েড অতিক্রিয়া ও অন্যান্য উপসর্গ

  • পেশি দৌর্বল্য বা হাতে কম্পন
  • দৃষ্টি শক্তিতে সমস্যা
  • তরল মল
  • অনিয়মিত ঋতুস্রাব

থাইরয়েড বৈকল্য না ঋতুবন্ধ

যেহেতু থাইরয়েড বৈকল্য হলে ঋতুচক্র এবং মনমেজাজে আসতে পারে পরিবর্তন, সেজন্য যৌবন উত্তর বয়সে মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুবন্ধ বলে ভ্রম হতে পারে। থাইরয়েড সমস্যা সন্দেহ হলে সহজ রক্তপরীক্ষা করলে সন্দেহ দূর করা সম্ভব।

কাদের পরীক্ষা করা উচিত

আমেরিকান থাইরয়েড এসোসিয়েশনের মতে, বয়স ৩৫ হলে, প্রতি পাঁচ বছর পর পর প্রত্যেকের থাইরয়েড ক্রিয়া পরীক্ষা করানো উচিত। যাদের উপসর্গ বা ঝুঁকি রয়েছে, এদের পুনপুন: পরীক্ষা করানো উচিত। ৬০ উর্দ্ধ মহিলাদের বেশি হয় হাইপোথাইরয়েডিজম। হাইপারথাইরয়েডিজমও ৬০ উর্দ্ধ পুরুষ ও মহিলাদের হতে পারে। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

থাইরয়েড নেক চেক

আয়নায় ভালো করে গলদেশ পরীক্ষা করলে গলায় স্ফীতি নজরে পড়তে পারে এবং তখন তেমন সন্দেহ হলে ডাক্তারকে দেখানো ভালো। মাথা পেছনে হেলান, একগ্লাস পানি পান করুন, এবং পানি গলাধকরনের সময় কণ্ঠমনির নিচে এবং কণ্ঠস্থির উপরে গলদেশের অংশটি নজর করুন। কোনও স্ফীতি আছে কিনা লক্ষ্য করুন, কয়েকবার দেখুন। সন্দেহ হলে ডাক্তারকে দেখান।

থাইরয়েড বৈকল্য নির্ণয়

ডাক্তার থাইরয়েড বৈকল্য সন্দেহ করলে রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। এই পরীক্ষা করে রক্তে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন মান পরিমাপ করা যায়। টিএসএইচ নামে এই প্রধান হরমোনটি নিয়ন্ত্রণ করে থাইরয়েডের কাজকর্ম। টিএসএইচ মান উঁচুতে থাকলে বোঝা গেলো যে থাইরয়েডক্রিয়া খুব কমে গেছে। টিএসএইচ মান নিচু থাকলে বোঝা যায় থাইরয়েড অতিসক্রিয় (হাইপারথাইরয়েড) প্রয়োজনে টি৪ মানও মাপা যেতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ইমেজিং পরীক্ষা ও থাইরয়েড বায়োপসি।

হাশিমটোর্স ডিজিজ

হাইপোথাইরয়েডিজমের সচরাচর কারণ হলো হাশিমটোর রোগ। এটি হলো একটি অটোইম্যুন বৈকল্য। এক্ষেত্রে শরীর নিজেই নিজের থাইরয়েড কোষের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায় এক অজ্ঞাত কারণে, ফলে ধ্বংস হতে থাকে থাইরয়েড কোষগুলো। তখন যথেষ্ট হরমোন  উত্পাদন আর হয়না। হাশিমটোর রোগ পরিবার পরস্পরায় হতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজমের অন্যান্য কারণ

কোনও কোনও ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক মূলে আছে যে পিটুইটারি গ্রন্থি এটিতে সমস্যা হলে হতে পারে থাইরয়েডের লঘুক্রিয়া। এই পিটুইটারি থেকে নি:সৃত হয় টিএসএইচ, যে হরমোন থাইরয়েডকে দেয় কাজ করার নির্দেশ। পিটুইটারি গ্রন্থি যথেষ্ট টিএসএইচ নি:সরণ না করলে তাহলে থাইরয়েড হরমোন মান যাবে কমে। আরও অন্যান্য কারণ হলো: থাইরয়েড প্রদাহ এবং ওষুধপত্র।

গ্রেভস্ ডিজিজ

থাইরয়েড অতিক্রিয়া বা হাইপারথাইরয়েটিজমের সবচেয়ে সচরাচর কারণ হলো ‘গ্রেভস্ ডিজিজ’। এটি একটি অটোইম্যুন বৈকল্য। দেহ নিজেই বিরোধী হয়ে উঠে থাইরয়েড গ্রন্থির একে আক্রমণ করে। প্রচুর থাইরয়েড হরমোন হয় নি:সৃত। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসে এ হলো এ রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ।

হাইপারথাইরয়েডিজমের অন্যান্য কারণ

হতে পারে থাইরয়েড নডুলের কারণে। থাইরয়েড গ্রন্থির ভেতরে জন্মায় গুটি এবং কখনও নি:সৃত করে হরমোন। গুটি খুব বড় হলে গলগন্ডের মত দেখা যায়। ছোট গুটি বা নডুল আলট্রাসাউন্ড দিয়ে চিহ্নিত করা যায়।

থাইরয়েড বৈকল্য থেকে জটিলতা

চিকিত্সা না হলে হাইপোথাইর-য়েডিজম থেকে ক্রমে ক্রমে রক্তে বাড়ে কোলেস্টেরল, স্ট্রোক ও হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। দীর্ঘ হলে থাইরয়েড হরমোনের খুব নিচু মান থেকে সজ্ঞাহীনতা এবং দেহতাপ বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যেতে পারে। হাইপারথাইরয়েডিজম চিকিত্সা না হলে, গুরুতর হূদযন্ত্র সমস্যা হতে পারে, হাড় ভাঙ্গনও ঘটতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজম চিকিত্সা

রোগ নির্ণয় হলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। বডি, থাইরয়েড হরমোন পিল, দুতিন সপ্তাহর মধ্যে হয় উন্নতি। দীর্ঘ মেয়াদী চিকিত্সায় ফিরে আসে বলশক্তি, নিচুমান কোলেস্টেরল এবং পর্যায়ক্রমে ওজন হানি। বেশিরভাগ রোগীকে জীবনভর পিল গ্রহণ করতে হয়।

হাইপারথাইরয়েডিজম চিকিত্সা

হাইপারথাইরয়েডিজমের সচরাচর চিকিত্সা হলো এন্টিথাইরয়েড চিকিত্সা। থাইরয়েড হরমোন যা উত্পন্ন হয় বেশি বেশি, একে নামিয়ে আনা হলো এ ওষুধের উদ্দেশ্য। সমস্যা ক্রমে চলে গেলেও অনেকের প্রয়োজন হতে পারে দীর্ঘ মেয়াদী চিকিত্সা। উপসর্গ উপশমের জন্যও প্রয়োজন হতে পারে অন্যান্য ওষুধ। দিতে হতে পারে তেজক্রিয়া আয়োডিন সার্জারির প্রয়োজনে। থাইরয়েড বৈকল্য সার্জারি থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণ করলে হাইপারথায়রয়েডিজম নিরাময় হতে পারে। তবে এন্টিথাইরয়েড ওষুধ কাজ না করলে বা খুব বেশি বড় গ্রন্তি হলে সার্জারি প্রয়োজন হয়। থাইরয়েড নড্যুলের জন্য প্রয়োজন হতে পারে সার্জারি করার।

থাইরয়েড ক্যান্সার

থাইরয়েড ক্যান্সার বিরল এবং তত ভয়ানক নয়। প্রধান উপসর্গ হলো গলায় স্ফীতি মাত্র ৫% থাইরয়েড নডুলে ক্যান্সারে পরিনত হতে পারে। প্রয়োজনে সার্জারি, তেজষ্কিয়া আয়োডিন চিকিত্সা।