সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

থাইরয়েড রোগে পরমাণু চিকিত্সা

১৯৪১ সাল থেকে অর্থাত্ বিগত প্রায় সাত দশক বিভিন্ন ধরনের থাইরয়েড রোগে পরমাণু চিকিত্সা খুবই জনপ্রিয় হচ্ছে। মানবদেহে গলার সামনে ঠিক চামড়ার নিচে প্রজাপতি-আকৃতির একটি ছোট্ট গ্রন্থি আছে যার কাজ থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ। এ হরমোনের অভাবে কর্মস্পৃহা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথার চুল পড়া, চামড়া খসখসে হওয়া ইত্যাদি অনেক সমস্যা দেখা যায়।

অন্যদিকে এর আধিক্য হলে অনিদ্রা, পাতলা পায়খানা, প্রচুর ক্ষুধা সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়, যাকে বলা হয় থাইরোটক্সিকোসিস বা অতি সক্রিয় থাইরয়েড। এদেশে ১৯৬১ সালে ঢাকায় প্রথম পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্যোগে ‘রেডিও আইসোটপ মেডিকেল সেন্টার’ স্থাপিত হয় ঢাকা চিকিত্সা মহাবিদ্যালয়ে একটি টিনশেডে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে পরমাণু চিকিত্সার সুযোগ-সুবিধা বিস্তৃতি লাভ করে।

একটি শিশু মাতৃগর্ভে আয়োডিনের অভাবে অপুষ্টি নিয়ে জন্মালে তার মেধার বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অথচ জন্মলগ্নেই তার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে তার জন্মগত থাইপোথাইরয়েডিজম আছে কি না তা নির্ণয় করে আশু চিকিত্সা করা যায় খুব সহজে।

জন্মগত নিষ্ক্রিয় থাইরয়েড রোগী নিয়মিতভাবে থাইরক্সিন বড়ি খেলে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। প্রথম অবস্থায় তার মাত্রা দৈনিক ১২.৫ থেকে ২৫ মাইক্রোগ্রাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে থাইরয়েড হরমোন মেপে ধীরে ধীরে তা বাড়াতে হয়। পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির মাত্রা ১০০ থেকে ২০০ মাইক্রোগ্রাম।
অতি সক্রিয় থাইরয়েড বা বিষাক্ত গলগণ্ড  রোগে তিন ধরনের চিকিত্সা আছে— ১. আয়োডিন-১৩১ তেজী পরমাণু, ২. কার্বিমাজল, ৩. অস্ত্রোপচার। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করা গেছে, আয়োডিন ১৩১ সবচেয়ে সস্তা, নিরাপদ এবং জনপ্রিয়।

থাইরয়েড ক্যান্সার (কর্কট) চিকিত্সায় প্রথমে অস্ত্রোপচার করে তারপর আয়োডিন-১৩১ খাওয়াতে হয় রোগীকে এবং নিয়মিত থাইরক্সিন বড়ি (প্রত্যহ ১০০ থেকে ২০০ মাইক্রোগ্রাম বা প্রয়োজনে আরও বেশি) খেতে হয়। থাইরয়েড ক্যান্সার হলে গলার সামনে গুটি দেখা যেতে পারে, কিন্তু দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন লসিকাগ্রন্থি, ফুসফুস, হাড়, মগজ প্রভৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না তা জানার জন্য তেজি পরমাণু চিত্র  খুবই সহায়ক।

থাইরয়েড গ্রন্থির যে কোনো রোগই তার নির্ণয়, চিকিত্সা এবং ফলোআপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেমন জন্মগত হাইপোথাইরয়েড এবং থাইরয়েড ক্যান্সার রোগীকে প্রতি তিন মাস বা ছয় মাস এবং অন্ততপক্ষে বছরে একবার পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অন্যথায় তার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে না।

থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রতিদিন আমাদের এবং পোষা পশু-পাখির পরিমিত আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। দুধ, ডিম ও গোশত উত্পাদন বৃদ্ধিতেও আয়োডিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শিশু-কিশোরদের মেধাবিকাশে থাইরয়েড হরমোনের প্রভাব বিভিন্ন দেশেই প্রমাণিত হয়েছে। উন্নত বিশ্বে নবজাতক শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের থাইরয়েড স্ক্রিনিং চালু রয়েছে বহু বছর ধরে। আমাদের দেশেও গত কয়েক বছর নবজাতক স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে সীমিত পরিসরে, যা সারাদেশেই করা উচিত।