সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ডায়াবেটিস ও চোখের রোগ

সাধারণত একজন মানুষের যেমন চোখে বিভিন্ন রোগ হতে পারে, তেমনি ডায়াবেটিস রোগীরও সেসব রোগ হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে চোখে বিশেষ কিছু রোগ হতে পারে। বস্তুত চোখের সব অংশই ডায়াবেটিসের জটিলতায় প্রভাবিত হতে পারে। এর মধ্যে কিছু কিছু জটিলতার কারণে চোখ অন্ধ হয়ে যায়।

চক্ষুকোটরের রোগের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে ফাঙ্গাস জীবাণু মিউকোর দ্বারা কোটরের কোষপ্রদাহ বা সেলুলাইটিস। এই রোগকে বলা হয় অরবটাল মিউকোর মাইকোসিস। রবার্টজ নামক একজন চিকিত্সক তার গবেষণায় দেখেছেন এই রোগীর শতকরা ৮০ জনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দ্রুত চিকিত্সা না করতে পারলে এ রোগে মৃত্যু অনিবার্য। উন্নত দেশে তাড়াতাড়ি চিকিত্সা করার পরও এ রোগে মৃত্যুর হার ৫৭ ভাগ।

এছাড়াও আরও অনেক রোগ হতে পারে ডায়াবেটিস রোগীদের। তার মধ্যে-

নেত্রবর্ণ
নেত্রবর্ণের ধমনি ও শিরার বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যেমন—ফুলে যাওয়া, জায়গায় জায়গায় মোটা হয়ে যাওয়া, সাধারণভাবে চিকন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এছাড়া নেত্রবর্ণের প্রদাহের হার ডায়াবেটিস রোগীদের বেশি।

অশ্রু
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগীর অশ্রুতে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। একে বলা হয় গ্লাইকোল্যাকরিয়া। সুতরাং অশ্রুতে চিনির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি পাওয়া গেলে রোগীর ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ডায়াবেটিস স্ক্রিনিংয়ের জন্য অশ্রু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কর্নিয়া বা নেত্রস্বচ্ছ
ডায়াবেটিসক রোগীর পলিনিউরোপ্যাথির মাধ্যমে কর্নিয়ার ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে কর্নিয়ার সংবেদ্যতা কমে যায়। কর্নিয়ার সামান্য ক্ষত রোগী টের পান না। এর ফলে অ্যাবরেশন, বার বার ক্ষয় হওয়া বা ক্ষত বেশি হয়। এছাড়া কর্নিয়াতে রঞ্জকায়ন ও কুঞ্চিত হওয়া ডায়াবেটিসের বিশেষ লক্ষণ। কর্নিয়ার কেন্দ্রে সূক্ষ্ম বাঁকা বা খাড়া দাগের মতো দেখা যায়। সাধারণত একই সঙ্গে দুই চোখেই এটা দেখা যায়। মহিলাদের এবং যাদের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি থাকে, তাদের বেলায় এই জটিলতার হার বেশি। তবে সৌভাগ্যবশত এ ধরনের কর্নিয়া হওয়ার ফলে চোখে দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না।

এজন্য বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার না করাই ভালো। ডায়াবেটিসে কর্নিয়ার ক্ষত শুকাতে সময় লাগে অনেক বেশি। আধুনিক ডেইলি ওয়ার নরম বা সফট কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেকটা নিরাপদ। কল-কারখানায় কাজ করার সময় বা খেলাধুলার সময় কর্নিয়া যাতে কোনোভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এসব কাজ করার সময় নিরাপদ চশমা ব্যবহার করাও জরুরি।

আইরিস বা কনীনিকা
রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে গেলে তা গ্লাইকোজেনে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় জমা হতে পারে। আইরিসের পিগমেন্ট এপিথেলিয়াল কোষের ডিজেনারেশন হয়ে চোখে বিভিন্ন জায়গায় যেমন—কর্নিয়ার পেছনে লেন্সের সামনের ক্যাপসুলে বা ট্রাবিকুলের জালে রঞ্জক বা পিগমেন্ট ছড়িয়ে যায়। এদিকে এসব কোষ অধঃপতিত বা ডিজেনারেশন হওয়ার ফলে আইরিসের মধ্যে শূন্যতা তৈরি করে। এই আইরিসশূন্যতা ডায়াবেটিসের একটি বিশেষ রোগ লক্ষণ।

আইরিসের সবচেয়ে মারাত্মক ডায়াবেটিক জটিলতা হচ্ছে আইরিসে নতুন রক্তনালির সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, দীর্ঘস্থায়ী চোখের রক্তসংরোধের কারণে এসব নতুন রক্তনালি তৈরি হয়। ডায়াবেটিস ছাড়াও রেটিনার শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়া, চোখের টিউমার, দীর্ঘস্থায়ী রেটিনার ডিটাচমেন্ট ইত্যাদি নানা কারণে রুবিওসিস আইরাইডিস হতে পারে। নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হলে তার চিকিত্সা খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে চোখের অ্যাঙ্গেলে সরাসরি লেজার, পুরো রেটিনাতে লেজার, চোখের চাপ কমানোর ওষুধ, বিশেষ ধরনের ফিলট্রেশন সার্জারি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চিকিত্সা করার চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওপরের সব চিকিত্সা একসঙ্গে করা হয় এবং মল্টেনো বা অন্য কোনো ভাল্ক্ভ চোখে লাগালে সুফল পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

লেন্স
ডায়াবেটিসে লেন্সে বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, চোখের পাওয়ারের হ্রাসবৃদ্ধি হয়। এছাড়া সময়ের আগেই বয়সজনিত ছানি, ক্ষণস্থায়ী লেন্স ঘোলা হওয়া ইত্যাদি নানা জটিলতা হতে পারে।

অক্ষিতারা বা পিউপিল
দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিক রোগীদের পিউপিল আকারে ছোট থাকে এবং পিউপিলে আলো ফেললে তার প্রতিক্রিয়া মন্থর হতে দেখা যায়। গবেষকদের মতে পিউপিলের এই পরিবর্তনগুলো দুটি কারণে হতে পারে —
—আইরিসে প্রচুর পরিমাণে গ্লাইকোজেন জমা হয়ে তা পুরু হয়ে যায়।
—ডায়াবেটিক অটোনিউরোপ্যাথিতে প্যারাসিমপ্যাথেটিকের তুলনায় সিমপ্যাথেটিক স্নায়ু বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ডাইলেটর পিউপিলি মাংসের তুলনায় স্ফিংকটার পিউপিলি মাংস বেশি কার্যকর থেকে পিউপিলের আকার ছোট রাখে। যেসব রোগীর পিউপিল যথেষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করেও বড় হয় না, তাদের বেলায় আইরিসের কোনা কেটে পিউপিলকে বড় করে অপারেশন করার প্রয়োজন হতে পারে। কখনও কখনও আইরিসের কাটা জায়গা পরে খুব চিকন সুতার সাহায্যে জোড়া দেয়া হয়।

অপটিক স্নায়ু
ডায়াবেটিসে রক্তের সূক্ষ্ম ধনি ও শিরাতে মাইক্রোএঞ্জিওপ্যাথি নামে পরিবর্তন হয়। এতে অপটিক স্নায়ুর রক্ত সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটে। ফলে ইশকেমিক অপটিক নিউরোপ্যাথি রোগটি নন-ডায়াবেটিকের তুলনায় ডায়াবেটিক রোগীদের বেশি হয়। মধ্যবয়সী বা বয়স্ক রোগীদের সাধারণত চোখে হঠাত্ করেই এ রোগটি শুরু হয়। দৃষ্টিশক্তি ও দৃষ্টির পরিসীমা কমে যায়, যা পরে আর উন্নত হয় না। ২০ বছর ও তার কম বয়স্ক জুভেনাইল ডায়াবেটিক রোগীর অনেক সময় হঠাত্ করে প্যাপিলোডিমা দেখা দিতে পারে। এই রোগ দুই চোখকেই ব্যাধিগ্রস্ত করে, অপটিক ডিস্কের গোড়ায় পানি জমে যায়, রক্তক্ষরণও হতে পারে। ধারণা করা হয়, অপটিক ডিস্কের পাশে অবস্থিত সূক্ষ্ম ক্যাপিলারি থেকে পানি বের হয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

ভিট্রিয়াস
ভিট্রিয়াসের জটিলতা সাধারণত রেটিনার জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে ভিট্রিয়াসে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং পেছন দিকের ভিট্রিয়াস ডিটাচমেন্ট বা বিয়োজন হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের ভিট্রিয়াসে লবণ দানার মতো অ্যাজটেরয়েড হায়ালোসিসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

রেটিনা বা অক্ষিপট
রেটিনাতে ডায়াবেটিসের জটিলতাকে সব মিলিয়ে বলা হয় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। রেটিনোপ্যাথি ছাড়াও ডায়াবেটিসে রেটিনার শিরা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা অনেকগুণ বেশি। রেটিনার শিরা বন্ধ হওয়া ডায়াবেটিসের একটি মারাত্মক জটিলতা। ম্যাকুলার শিরা বন্ধ হলে রোগীর দৃষ্টি কমে যায়। যে স্থানে শিরা বন্ধ হয়, সেখানকার অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে রোগীর দৃষ্টির পরিসীমাতে অন্ধ এলাকার সৃষ্টি হয়। খুব ছোট শিরা বন্ধ হলে রোগীর কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে, যা চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরীক্ষাতে ধরা পড়ে। রেটিনাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ, কটন উল স্পট, শিরা স্ফীত হওয়া ইত্যাদি এই রোগের চিহ্ন। সময়মত লেজারের সাহায্যে চিকিত্সা করা না হলে ২৫ ভাগ রোগীর রেটিনাতে কিংবা আইরিসের নতুন রক্তনালি তৈরি হয়ে নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হতে পারে, যার পরিণতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গ্গুম্লকোমা
ডায়াবেটিসে নতুন রক্তনালি তৈরি হয়ে মারাত্মক নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হতে পারে। এছাড়া প্রাথিক অ্যাঙ্গেল খোলা গ্লুকোমা- ডায়াবেটিক রোগীদের নন-ডায়াবেটিকদের তুলনায় ১.৪ গুণ বেশি হয়। রোগীর বয়স এবং ডায়াবেটিসের মেয়াদের ওপর এই ধরনের গ্লুকোমার প্রাদুর্ভাব অনেকটা নির্ভর করে। স্বাভাবিক অন্যান্য গ্লুকোমা রোগীদের মতো ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধের সাহায্যে গ্লুকোমার চিকিত্সার ফলাফল খারাপ নয়। তবে বিটা এড্রেনার্জিক ব্লকার যেমন টিমোলোল ওষুধের কারণে হাইপো গ্লাইসেমিয়ার মতো বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সব ডায়াবেটিক+গ্গুম্লকোমা রোগীর রক্তে লবণের পরিমাণ মাঝে মাঝে দেখা উচিত। ওষুধের চিকিত্সা ঠিকমত দেয়া না গেলে বা ভালো ফলাফল না পাওয়া গেলে লেজার চিকিত্সা দেয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিসে অটোনামিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়ার ফলে সিমপ্যাথিক ও প্যারাসিমপ্যাথিক সংবেদ্যতা বেড়ে যায়। এর ফলে চোখের আইরিস লেন্স ডায়াফ্রাম সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং সামনের চেম্বার স্বল্প গভীর হয়ে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধীরে ধীরে সামনের চেম্বারের অ্যাঙ্গল সরু হয়ে যায়। এর ফলে সামনের চেম্বার থেকে অ্যাকুয়াস হিউমার অ্যাঙ্গেলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হঠাত্ করে অ্যাঙ্গেল বন্ধ গ্লুকোমার সৃষ্টি হতে পারে। এই রোগে চোখে খুব ব্যথা হয়, লাল হয়, দৃষ্টি কমে যায়, বমি বমি ভাব এমনকি বমি হয়ে যায়। অ্যাঙ্গেল বন্ধ গ্লুকোমা চোখের একটি জরুরি রোগ। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি করে চোখের চাপ কমানো প্রয়োজন হয় এবং পরে চোখের অন্যান্য পরীক্ষার পর লেজারের সাহায্যে অথবা অপারেশন করে এই রোগের চিকিত্সা করা হয়ে থাকে।