সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ডায়াবেটিস ও চোখের রোগ

সাধারণত একজন মানুষের যেমন চোখে নানা রোগ হতে পারে, তেমনি ডায়াবেটিস রোগীরও সেসব রোগ হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে চোখে বিশেষ কিছু রোগ হতে পারে। বস্তুত চোখের সব অংশই ডায়াবেটিসের জটিলতায় প্রভাবিত হতে পারে। এর মধ্যে কিছু কিছু জটিলতার কারণে চোখ অন্ধ হয়ে যায়। চক্ষুকোটরের রোগের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে ফাংগাস জীবাণু মিউকোর দ্বারা কোটরের কোষপ্রদাহ বা সেলুলাইটিস। এ রোগকে বলা হয় অরবটাল মিউকোর মাইকোসিস।

রবার্টজ নামের একজন চিকিত্সক তার গবেষণায় দেখেছেন, এ রোগীর শতকরা ৮০ জনই ডায়াবেটিক। দ্রুত চিকিত্সা না করতে পারলে এ রোগে মৃত্যু অনিবার্য। উন্নত দেশে ত্বরিত চিকিত্সা করার পরও এ রোগে মৃত্যুর হার শতকরা ৫৭ ভাগ। এসব রোগীর রোগ লক্ষণের মধ্যে চোখ লাল হয়, পানি পড়ে, পাতা ফুলে যায়, চোখ কোটর থেকে সামনে বেরিয়ে আসে, চোখে প্রচ ব্যথা হয়, নাক দিয়ে পানি ও রক্ত পড়ে, ভেতর ও বাইরে নেত্রপক্ষাঘাত, চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়া ইত্যাদি থাকতে পারে। পরীক্ষা করলে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে এবং অনেক সময় ‘ডায়াবেটিস কিটোএসিডোসিস’ থাকে।

চোখে ক্ষতস্থানের কলা বা টিস্যু ১০ শতাংশ পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং স্যাবোরেডস অ্যাগার মিডিয়াতে পরীক্ষা করলে ওই ফাংগাস দেখা যায়। শিরার মধ্যে এমুটারিসিন বি এবং মুখে মাইকোস্টাটিন ইত্যাদি ওষুধের সাহায্যে এ মারাত্মক প্রদাহের চিকিত্সা করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় চোখ তুলে ফেলে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। ডায়াবেটিসের কারণে চোখের রেকটাস ও অক্ষিগোলকের বাইরের মাংসপেশীয় স্নায়ু যেমন তৃতীয়, চতুর্থ এবং ষষ্ঠ ক্রানিয়াল নার্ভ এবং সপ্তম ক্রনিয়াল নার্ভের পক্ষাঘাত হতে পারে। সাধারণত একজন রোগীর একটি নার্ভের পক্ষাঘাত হয়। একে বলা হয় একক নিউরোপ্যাথি। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে এই একক নিউরোপ্যাথির হার একেবারে কম নয়; আর সেজন্য যে কোনো লোকের এ ধরনের একক নিউরোপ্যাথি হলে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা খুবই প্রয়োজনীয়।

তৃতীয়, চতুর্থ এবং ষষ্ঠ ক্রনিয়াল নার্ভের মধ্যে তৃতীয় এবং ষষ্ঠ নার্ভের পক্ষাঘাতের হার সবচেয়ে বেশি। তৃতীয় ক্রনিয়াল নার্ভের পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হলে রোগীর চোখের উপরের পাতা ঝুলে পড়েও চোখ বন্ধ হয়ে যায়, চোখ নিচে ও বাইরের দিক ঘুরে থাকে। শতকরা ৮০ জনের বেশি এসব রোগীর অক্ষিতারা বা পিউপিল স্বাভাবিক থাকে। ডায়াবেটিস ছাড়া আঘাত, টিউমার, রক্তনালীর অ্যানিউরিজমের কারণে তৃতীয় নার্ভ প্যারালাইসিস হলে পিউপিল স্বাভাবিক আকারের চেয়ে বড় এবং স্থির হয়ে থাকে।

অন্যদিকে ষষ্ঠ ক্রানিয়াল নার্ভ প্যারালাইসিস হলে চোখ ভেতরের দিকে বা নাকের দিকে ঘুরে থাকে, যা কোনোভাবেই বাইরের দিকে ঘুরিয়ে আনা যায় না। এছাড়া যুগ্মদৃষ্টি বা ডিপলোপিয়া হওয়ার দরুন রোগীর দুই চোখ খুলে চলাফেরা করায় অসুবিধা হয়। ডায়াবেটিসে এসব একক নিউরোপ্যাথির সঠিক কারণ জানা যায় না। যাদের ডায়াবেটিস পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে, তাদের বেলাতেও এ অবস্থা হতে পারে। আবার অনেকের এ রোগের কারণে পরীক্ষা করে সর্বপ্রথম ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব রোগীর ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখা যায়। একক নিউরোপ্যাথি সাধারণত ২-৬ মাসের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। শুধু ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং সূক্ষ্ম দৃষ্টির কারণে চলাফেরায় অসুবিধা হলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত চোখটিকে প্যাড দিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে রাখতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের অক্ষিপল্লবের প্রদাহ, যেমন ব্লেফারাইটিস ও অঞ্জনি বেশি দেখা যায়। ব্লেফারাইটিস রোগে অক্ষিপল্লবের প্রান্তে ছোট ছোট খুশকি দানার মতো হয়। এসব রোগীর অনেকের মাথায়ও খুশকি থাকে। রোগীর চোখের পাতায় অস্বস্তি অনুভব করেন এবং এটা বেশ চুলকায়। অনেকের বেলায় অক্ষিপল্লবের প্রান্তে ক্ষত হয়ে যেতে পারে। চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড মলম অন্তত মাসখানেক লাগালেও এ রোগ ভালো হয়। অক্ষিপল্লবের কেশপ্রান্তের ফলিকল ও তার নিকটতম জেইস এবং মোল গ্রন্থির প্রদাহকে অঞ্জনি বলে। এ রোগে অক্ষিপল্লবে বেশ ব্যথা হয়, ফুলে যায় এবং ২-৩ দিনের মধ্যে সাদা পুঁজ বিন্দু দেখা দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২-১ দিন গরম সেঁক দিলেও ব্যাধিগ্রস্ত কেশটি ধরে টেনে ফেলে দিলে পুঁজ বেরিয়ে যায় ও রোগ ভালো হয়ে যায়। তবে যে কোনো প্রদাহের বেলায় ডায়াবেটিস রোগীর ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তা না হলে এ প্রদাহ চোখের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নেত্রবর্ণ
নেত্রবর্ণের ধমনি ও শিরার বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যেমন ফুলে যাওয়া, জায়গায় জায়গায় মোটা হয়ে যাওয়া, সাধারণভাবে চিকন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এছাড়া নেত্রবর্ণের প্রদাহের হার ডায়াবেটিস রোগীদের বেশি।

অশ্রু
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক রোগীর অশ্রুতে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। একে বলা হয় গ্লাইকোল্যাকরিয়া। সুতরাং অশ্রুতে চিনির পরিমাণ অস্বাভাবিকতা বেশি পাওয়া গেলে রোগীর ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ডায়াবেটিস স্ক্রিনিংয়ের জন্য অশ্রু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কর্নিয়া, নেত্রস্বচ্ছ
ডায়াবেটিস রোগীর পলিনিউরোপ্যাথির মাধ্যমে কর্নিয়ার ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যায়। এতে কর্নিয়ার সংবেদ্যতা কমে যায়। কর্নিয়ার সামান্য ক্ষত রোগী টের পান না। এর ফলে অ্যাবরেশন, বারবার ক্ষয় হওয়া বা ক্ষত বেশি হয়। এছাড়া কর্নিয়াতে রঞ্জকায়ন ও কুঞ্চিত হওয়া ডায়াবেটিসের বিশেষ লক্ষণ। ডায়াবেটিসে কর্নিয়ার কুঞ্চনের ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে। কর্নিয়ার কেন্দ্রে সূক্ষ্ম বাঁকা বা খাড়া দাগের মতো দেখা যায়। সাধারণত একই সঙ্গে দু’চোখে এটা দেখা যায়। মহিলাদের এবং যাদের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি থাকে, তাদের বেলা এ জটিলতার হার বেশি। তবে সৌভাগ্যবশে এ ধরনের কর্নিয়া হওয়ায় চোখে দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না।

এজন্য বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার না করাই ভালো। কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারের কারণে সামান্যতম অ্যাবরেশন রোগী বুঝতে না-ও পারেন। এতে অনেক সময় সামান্য থেকে বড় ক্ষত হয়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসে কর্নিয়ার ক্ষত শুকাতে সময় লাগে অনেক বেশি। আধুনিক ডেইলি ওয়ার নরম বা সফট কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেকটা নিরাপদ। কল-কারখানায় কাজ করার সময় বা খেলাধুলার সময় কর্নিয়া যাতে কোনোভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এসব কাজ করার সময় নিরাপদ চশমা ব্যবহার করাও জরুরি।

আইরিস, কনিনিকা
রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে গেলে তা গ্লাইকোজেনে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় জমা হতে পারে। আইরিসের পিগমেন্ট এপিথেলিয়াল কোষের ডিজেনারেশন হয়ে চোখে বিভিন্ন জায়গায়, যেমন কর্নিয়ার পেছনে লেন্সের সামনের ক্যাপসুলে বা ট্রাবিকুলের জালে রঞ্জক বা পিগমেন্ট ছড়িয়ে যায়। এদিকে এসব কোষ অধঃপতিত বা ডিজেনারেশন হওয়ায় আইরিসের মধ্যে শূন্যতা তৈরি করে। এই আইরিস শূন্যতা ডায়াবেটিসের একটি বিশেষ রোগ লক্ষণ।

আইরিসের সবচেয়ে মারাত্মক ডায়াবেটিক জটিলতা হচ্ছে, আইরিস নতুন রক্তনালির সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, দীর্ঘস্থায়ী চোখের রক্ত সংরোধের কারণে এসব নতুন রক্তনালী তৈরি হয়। ডায়াবেটিস ছাড়া রেটিনার শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়া, চোখের টিউমার, দীর্ঘস্থায়ী রেটিনার ডিটাচমেন্ট ইত্যাদি নানা কারণে রুবিওসিস আইরাইডিস হতে পারে। ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে যাদের দ্রুত বিসৃ্তত ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আছে বা যাদের ভিট্রেক্টমি নামের অপারেশন করা হয়, তাদের বেলায় এই রুবিওসিস আইরাইডিসের হার অনেক বেশি। রুবিওসিস সাধারণত প্রথম দেখা যায় পিউলের কোনায়, যা দেখতে আঙ্গুরের থোকার মতো লাগতে পারে। পরে এখান থেকে খুব সূক্ষ্ম রক্তনালী আইরিসের ওপর বেয়ে চোখের কোনায় পৌঁছে। সেখানে এই রক্তনালীর সঙ্গে ফাইব্রাস টিস্যু গজায়, ফাইব্রোভ্যাসকুলার জাল তৈরি হয় এবং এর কারণে পেরিফেরাল ইন্টেরিয়র সাইনেকিয়া সৃষ্টি হয়।

এতে চোখের অ্যাঙ্গেল বন্ধ হয়ে এক ধরনের গ্লুকোমার সৃষ্টি হয়, যার নাম নিওভাসকুলার গ্লুকোমা। একবার এই নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হলে তার চিকিত্সা খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে চোখের অ্যাঙ্গেলে সরাসরি লেজার, পুরো রেটিনাতে লেজার, চোখের চাপ কমানোর ওষুধ, বিশেষ ধরনের ফিলট্রেশন সার্জারি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চিকিত্সা করার চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপরের সব চিকিত্সা একসঙ্গে করা হয় এবং মল্টেনো বা অন্য কোনো ভালব চোখে লাগালে সুফল পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ডায়াবেটিসের আরেকটি জটিলতা হচ্ছে অ্যাক্টোপিওন ইউভি। পিউপিলের কোনায় ফাইব্রোভাস কুলার টিস্যু তৈরি হলে তা আইরিসের পেছনের দিকের পিগমেন্ট স্তরকে টেনে সামনের দিকে নিয়ে আসে। এতে পিউপিলের কোনায় কালো রঙের স্তর দেখা যায়। এরই নাম এক্টোপিওন ইউভি। এ জটিলতা থাকলে সামনের সিগমেন্টে কোনো অপারেশন করলে প্রচুর পিগমেন্ট ছাড়াতে দেখা যায়।

লেন্স : ডায়াবেটিসে লেন্সে বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, চোখের পাওয়ারের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। এছাড়া সময়ের আগেই বয়সজনিত ছানি, ক্ষণস্থায়ী লেন্স ঘোলা হওয়া ইত্যাদি নানা জটিলতা হতে পারে।
অক্ষিতারা বা পিউপিল : দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিক রোগীদের পিউপিল আকারে ছোট থাকে এবং পিউপিলে আলো ফেললে তার প্রতিক্রিয়া মন্থর হতে দেখা যায়। গবেষকদের মতে, পিউপিলের এ পরিবর্তনগুলো দুটি কারণে হতে পারে— আইরিসে প্রচুর পরিমাণে গ্লাইকোজেন জমা হয়ে তা পুরু হয়ে যায়।

ডায়াবেটিক অটোনিউরোপ্যাথিতে প্যারাসিমপ্যাথেটিকের তুলনায় সিমপ্যাথেটিক স্নায়ু বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে ডাইলেটর পিউপিলি মাংসের তুলনায় স্ফিংকটার পিউপিলি মাংস বেশি কার্যকর থেকে পিউপিলের আকার ছোট রাখে। ডায়াবেটিক রোগীর পিউপিল শুধু ছোটই থাকে না, একে মাইড্রিয়েটিক ওষুধ দিলেও তা বেশি বড় হতে চায় না। সাধারণত রোগীর এতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু লেন্সের কেন্দ্রে ছানি পড়তে শুরু করলে এসব রোগী দ্রুত কম দেখতে শুরু করেন। এদের ছানি অপারেশনও দ্রুত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আবার ছানি অপারেশনের সময় পিউপিল অবশ্যই বড় করে নিতে হয়। যেসব রোগীর পিউপিল যথেষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করেও বড় হয় না, তাদের বেলায় আইরিসের কোনা কেটে পিউপিলকে বড় করে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। কখনও কখনও আইরিসের কাটা জায়গা পরে খুব চিকন সুতার সাহায্যে জোড়া দেয়া হয়।

অপটিক স্নায়ু : ডায়াবেটিসে রক্তের সূক্ষ্ম ধমনি ও শিরায় মাইক্রোএঞ্জিওপ্যাথি নামের পরিবর্তন হয়। এতে অপটিক স্নায়ুর রক্ত সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটে। এতে ইশকেমিক অপটিক নিউরোপ্যাথি রোগটি নন-ডায়াবেটিকের তুলনায় ডায়াবেটিক রোগীদের বেশি হয়। মধ্যবয়সী বা বয়স্ক রোগীদের সাধারণত চোখে হঠাত্ করেই এ রোগটি শুরু হয়। দৃষ্টিশক্তি ও দৃষ্টির পরিসীমা কমে যায়, যা পরে আর উন্নত হয় না। ২০ বছর ও তার কম বয়স্ক জুভেনাইল ডায়াবেটিক রোগীর অনেক সময় হঠাত্ করে প্যাপিলোডিমা দেখা দিতে পারে। এ রোগ দুই চোখকেই ব্যাধিগ্রস্ত করে, অপটিক ডিস্কের গোড়ায় পানি জমে যায়, রক্তক্ষরণও হতে পারে।

ধারণা করা হয়, অপটিক ডিস্কের পাশে অবস্থিত সূক্ষ্ম ক্যাপিলারি থেকে পানি বের হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এখানে মাইক্রোএঞ্জিপ্যাথির কোনো ভূমিকা নেই। রোগী সাধারণত ভালোই দেখতে পান, তবে প্যাপিলোডিমা হওয়ার দরুন দৃষ্টির পরিসীমার মধ্যে কিছু ত্রুটি দেখা যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ অসুখে প্যাপিলোডিমা নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তবে অন্য একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এসব রোগীর চারজনের মধ্যে তিনজনেরই অদূর ভবিষ্যতে প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়েট ও বিথামের গবেষণায় বলা হয়েছে, নন-ডায়াবেটিকদের তুলনায় ডায়াবেটিকদের চোখে টক্সিক অ্যামব্লাইওপিয়া এবং অপটিক এট্রািফি হওয়ার সম্ভাবনা সামান্য বেশি। ১৯৩৮ সালে গবেষক ওলফ্রাম তার নামে একটি সিনড্রম আবিষ্কার করেছিলেন। এ সিনড্রমে অল্পবয়স্ক জুভেনাইল ডায়াবেটিক রোগীর চোখে অপটিক এট্রেফি থাকে। এছাড়া কানে কম শোনা, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা, যৌনরসাল্পতা ইত্যাদি উপসর্গ থাকতে পারে।

ভিট্রিয়াস : ভিট্রিয়াসের জটিলতা সাধারণত রেটিনার জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে ভিট্রিয়াসে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং পেছন দিকের ভিট্রিয়াস ডিটাচমেন্ট বা বিয়োজন হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের ভিট্রিয়াসে লবণ দানার মতো অ্যাজটেরয়েড হায়ালোসিসের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

রেটিনা বা অক্ষিপট : রেটিনাতে ডায়াবেটিসের জটিলতাকে সব মিলিয়ে বলা হয় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। রেটিনোপ্যাথি ছাড়া ডায়াবেটিসে রেটিনার শিরা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা অনেক গুণ বেশি। রেটিনার শিরা বন্ধ হওয়া ডায়াবেটিসের একটি মারাত্মক জটিলতা। ম্যাকুলার শিরা বন্ধ হলে রোগীর দৃষ্টি কমে যায়। যে স্থানে শিরা বন্ধ হয়, সেখানকার অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রোগীর দৃষ্টির পরিসীমাতে অন্ধ এলাকার সৃষ্টি হয়। খুব ছোট শিরা বন্ধ হলে রোগীর কোনো উপসর্গ না-ও থাকতে পারে, যা চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরীক্ষায় ধরা পড়ে। রেটিনাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ, কটন উল স্পট, শিরা স্ফীত হওয়া ইত্যাদি এ রোগের চিহ্ন। সময়মত লেজারের সাহায্যে চিকিত্সা করা না হলে শতকরা ২৫ ভাগ রোগীর রেটিনাতে কিংবা আইরিসের নতুন রক্তনালী তৈরি হয়ে নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হতে পারে—যার পরিণতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

রক্তে শর্করা বেশি হয়ে বিপাকক্রিয়া ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যদি রক্তে চর্বি জাতীয় লাইপোপ্রোটিন বেশি হয়ে যায়, তাহলে অফথ্যালমোস্কোপের সাহায্যে রেটিনার রক্তনালীতে তা প্রায় দুধের মতো সাদা রঙের দেখা যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় লাইপিমিয়া রেটিনালিজ।

গ্লুকোমা : ডায়াবেটিসে নতুন রক্তনালী তৈরি হয়ে মারাত্মক নিওভাসকুলার গ্লুকোমা হতে পারে। এছাড়া প্রাথিক অ্যাঙ্গেল খোলা গ্লুকোমা-ডায়াবেটিক রোগীদের নন-ডায়াবেটিকদের তুলনায় ১.৪ গুণ বেশি হয়। রোগীর বয়স এবং ডায়াবেটিসের মেয়াদের ওপর এ ধরনের গ্লুকোমার প্রাদুর্ভাব অনেকটা নির্ভর করে। স্বাভাবিক অন্যন্য গ্লুকোমা রোগীদের মতো ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধের সাহায্যে গ্লুকোমার চিকিত্সার ফলাফল খারাপ নয়। তবে বিটা অ্যাড্রেনার্জিক ব্লকার, যেমন টিমোলোল ওষুধের কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মতো বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

গ্লুকোমার অন্য একটি ওষুধ অ্যাসিটাজোলামইড—যা ডায়ামক্স, এসিমক্স নামে পাওয়া যায়। অনেক দিন ধরে এ ওষুধ খেতে থাকলে মেটাবোলিক অ্যাসিডোসিস হতে পারে, যার সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিক অ্যাসিডোসিস থাকলে রোগীর চিকিত্সা জটিল হতে পারে। এজন্য এসব ডায়াবেটিক+গ্লুকোমা রোগীর রক্তে লবণের পরিমাণ মাঝে মধ্যে দেখা উচিত। ওষুধের চিকিত্সা ঠিকমত দেয়া না গেলে বা ভালো ফলাফল না পাওয়া গেলে লেজার চিকিত্সা দেয়া যেতে পারে। যদিও অ্যাঙ্গে বন্ধ গ্লুকোমার হার ডায়াবেটিক এবং নন-ডায়াবেটিকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, তবু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তির চোখে স্বল্প-গভীর অ্যান্টিরিয়র চেম্বার থাকে, তাদের বেশিরভাগ লোকের শর্করা সহ্যগুণের ঘাটতি থাকে।

পরে এদের অনেকে আবার ডায়াবেটিসে রূপান্তরিত হতে পারে। ডায়াবেটিসে অটোনমিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়ায় সিমপ্যাথিক ও প্যারাসিমপ্যাথিক সংবেদ্যতা বেড়ে যায়। এতে চোখের আইরিস লেন্স ডায়াফ্রাম সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং সামনের চেম্বার স্বল্পগভীর হয়ে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধীরে ধীরে সামনের চেম্বারের অ্যাঙ্গেল সরু হয়ে যায়, এতে সামনের চেম্বার থেকে অ্যাকুয়াস হিউমার অ্যাঙ্গেলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হঠাত্ করে অ্যাঙ্গেল বন্ধ গ্লুকোমার সৃষ্টি হতে পারে। এই রোগে চোখে খুব ব্যথা হয়, লাল হয়, দৃষ্টি কমে যায়, বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হয়ে যায়। অ্যাঙ্গেল বন্ধ গ্লুকোমা চোখের একটি জরুরী রোগ। ত্বরিত হাসপাতালে ভর্তি করে চোখের চাপ কমানো প্রয়োজন হয় এবং পরে চোখের অন্যান্য পরীক্ষার পর লেজারের সাহায্যে অথবা অপারেশন করে এ রোগের চিকিত্সা করা হয়ে থাকে।