সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ডায়াবেটিস ও চোখের ছানি

health.masudkabir.comচোখের লেন্স বা এর আবরণ (ক্যাপসুল) ঘোলা হয়ে যাওয়াকেই বলা হয় ছানি বা ক্যাটার্যাক্ট। আমাদের দেশে অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে চোখের ছানি। ছানির প্রথম অবস্থায় লেন্সের কিছু অংশ ঘোলাটে হয় এবং খুব ধীরে ধীরে দৃষ্টির প্রখরতা কমতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করলে দৃষ্টির প্রখরতা বাড়ানো সম্ভব। তবে ক্রমে ক্রমে লেন্স আরও ঘোলাটে হতে থাকে এবং ২-৩ বছরের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ লেন্সই ঘোলা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এ অবস্থাকে ‘ছানি পাকা’ বলে অভিহিত করেন।

চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ম্যাচিওর ক্যাটার্যাক্ট। সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সের মধ্যে এ ধরনের ছানি পড়তে দেখা যায়। অবশ্য অনেকের বংশগত কারণে এ বয়সের আগে বা পরে ছানি পড়তে পারে। এই বয়সজনিত ছানিকে বলা হয় সেনাইল ক্যাটার্যাক্ট । বয়সজনিত ছানি ছাড়া ডায়াবেটিস, চোখের বিভিন্ন প্রদাহ ও অসুখে, গর্ভাবস্থায় মায়ের রুবেলা বা অন্য কোনো জীবাণুর প্রদাহ, শারীরিক কিছু অসুখ ইত্যাদি নানা কারণে চোখে যে কোনো বয়সে ছানি পড়তে পারে।

ডায়াবেটিসে ছানি পড়ার ঝুঁকি বেশি

ডায়াবেটিসে সন্দেহাতীতভাবে ছানি পড়ার ঝুঁকি খুব বেশি। ‘ফ্রামিংহাম আই স্টাডি’ নামের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নন-ডায়াবেটিকের তুলনায় ডায়াবেটিক রোগীদের ৪০-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ছানি হওয়ার হার কিছুটা বেশি। কিন্তু ৫০-৬০ বছরে এই হার ২-৩ গুণ বেশি। আবার ৬৯ বছর বয়সের পর ডায়াবেটিক ও নন-ডায়াবেটিক রোগীদের ছানি হওয়ার হার সমান সমান। সুতরাং এ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ডায়াবেটিক রোগীদের বেলায় ৬৯ বছর বয়সের আগে পর্যন্ত বয়সজনিত ছানি তুলনামূলকভাবে দ্রুত শুরু হয় এবং তাদের চিকিত্সা বা ছানি অপারেশন তুলনামূলক কম বয়সে সম্পন্ন করা প্রয়োজন হয়।

কিন্তু অল্প বয়স্ক জুভেনাইল ডায়াবেটিকদের চোখে এক ধরনের ছানি দেখা যায়, যা দেখতে সাদা ফোঁটা ফোঁটা হতে পারে বা সাদা ফোঁটা ও দাগের মতো দেখা যায়। স্লিট ল্যাম্প যন্ত্রের সাহায্যে এই ছানিকে তুষারকণার মতো মনে হয়। অনেকের চেখে আবার সূক্ষ্ম সূঁচের মতো ঘোলা দাগ দেখা যায়। এই দুই ধরনের ছানিকে বলা হয় মূল ডায়াবেটিক ছানি। মূল ডায়াবেটিক ছানি সাধারণত জুভেনাইল ডায়াবেটিক, যাদের রক্তের শর্করা খুবই উঁচু মাত্রায় থাকে এবং অনিয়ন্ত্রিত বিপাক প্রক্রিয়া বিদ্যমান, তাদের বেলাতেই বেশি দেখা যায়।

এ কারণে উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে এবং উন্নয়নশীল দেশে মূল ডায়াবেটিক ছানি বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় এই ছানি ধরা পড়লে এবং ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করলে ঘোলা লেন্সের দাগ আবার পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে, অর্থাত্ এই ছানিকে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিত্সা করালে আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হয়।

রক্তে শর্করা বেশি মাত্রায় হয়ে গেলে লেন্সে সরবিটল জমা হতে থাকে। অ্যালডোজ্ রিডাকটেজ নামক একটি এনজাইম এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এ অবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েকদিনের মধ্যে ছানি পড়ে যেতে পারে। অ্যালডোজ রিডাকটেজের এই ভূমিকার কথা বিবেচনা করে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা ছানি প্রতিরোধ করার উপায় হিসেবে ওই এনজাইমের সংবাধক ব্যবহার করেছেন। যদিও আজ পর্যন্ত ছানি প্রতিরোধক কোনো এনজাইম বা ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

ছানির চিকিত্সা
ছানির প্রাথমিক অবস্থায় চশমার সাহায্যে দৃষ্টির প্রখরতা বাড়ানো গেলেও আস্তে আস্তে রোগী যখন তার স্বাভাবিক কাজকর্মে অসুবিধা অনুভব করেন, তখনই ছানির একমাত্র চিকিত্সা অপারেশন করতে হবে। আমাদের দেশে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে, রোগীর ছানি সম্পূর্ণ না পাকলে তা অপারেশনের যোগ্য হয় না। এই ধারণাটি একেবারেই ঠিক নয়। বরং বেশি পেকে গেলেই চোখের অনেক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে এবং পরে অপারেশন করেও আশানুরূপ দৃষ্টি ফিরে নাও আসতে পারে।

ডায়াবেটিক রোগীদের ছানি অপারেশনের হার নন-ডায়াবেটিকদের তুলনায় ৪ থেকে ৬ গুণ বেশি। এসব রোগীর রেটিনোপ্যাথির দরুন দৃষ্টি কমে না গেলে, অপারেশনের ফলাফল নন-ডায়াবেটিক রোগীর সমান সমান। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে এই অপারেশনে অতিরিক্ত কোনো ঝুঁকি নেই, তবে ডায়াবেটিস রোগের কারণে এদের অপারেশনের ক্ষত শুকাতে একটু বেশি সময় লাগাতে পারে। অনেকের বেলায় অপারেশনের পর তুলনামূলকভাবে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, আইরিস এবং রেটিনার নতুন রক্তনালি ও ম্যাকুলার ইডিমা ইত্যাদির হার সামান্য বেশি। তবে বর্তমানে আধুনিক ছানির অপারেশনে লেন্সের পেছনের আবরণী রেখে দেয়া হয় বলে এই হার অনেকাংশে কমে গেছে। একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ডায়াবেটিক রোগীদের ছানি অপারেশনের পর ৯০-৯৫ শতাংশ রোগীই কার্যকরী দৃষ্টি ক্ষমতা ফিরে পেয়ে থাকেন।

ছানির চিকিত্সায় অপারেশন
ফ্যাকো সার্জারি : ছানির আধুনিক চিকিত্সা হচ্ছে ফ্যাকো সার্জারি। চোখের পাশে মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার ছিদ্র করে এই অপারেশন করা হয়। লেন্সের উপরের আবরণে গোল করে কেটে এর মধ্যেই ফ্যাকো মেশিনের সাহায্যে আলট্রাসনিক পাওয়ার দিয়ে লেন্সটিকে টুকরা টুকরা করে গলানো হয়। এভাবে লেন্সটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেলে এই আবরণের মধ্যেই একটি কৃত্রিম লেন্স বসানো হয়।

ফোল্ডঅ্যাবল লেন্স বা ভাঁজ করা যায় এমন লেন্স ব্যবহার করলে ওই ছিদ্র দিয়েই লেন্স ভাঁজ করে প্রবেশ করানো হয়। চোখের ভেতরে এই লেন্সটি সুন্দরভাবে সেট হয়ে যায়। ফোল্ডঅ্যাবল লেন্স ব্যবহার না করলে ওই ছিদ্রটিকে ৫-৬ মি.মি. বড় করে ওই মাপের পিএমএমএ বা হার্ড লেন্স প্রবেশ করানো হয়। ২ পদ্ধতিতেই সেলাইয়ের প্রয়োজন হয় না।

অভিজ্ঞ ফ্যাকো সার্জনরা চোখের পাশে একটি ইনজেকশন দিয়ে অবশ করে অথবা কোনো কোনো রোগীকে ইনজেকশন ছাড়াই শুধু ফোঁটা ওষুধ ব্যবহার করে চোখের উপরে অবশ করে এই অপারেশন করে থাকেন।
এসআইসিএস : লেন্স বেশি ম্যাচিউর হয়ে গেলে অনেক সময় মেশিনের সাহায্যে লেন্স গলানো কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এসব ক্ষেত্রে স্মল ইনসিশন ক্যাটার্যাক্ট সার্জারি বা এসআইসিএস খুবই উপযোগী। এই পদ্ধতিতেও ফ্যাকো পদ্ধতির মতো লেন্সের আবরণীর উপরের অংশ গোল করে কেটে এর ভেতর থেকে লেন্সের শক্ত অংশটি বা নিউক্লিয়াসটিকে পানি, জেল বা ভেকটিস যন্ত্রের সাহায্যে বের করা হয়। পরে লেন্সের নরম অংশ পরিষ্কার করে সাধারণত হার্ড লেন্স চোখে দেয়া হয়।

এই অপারেশনে লেন্সের ম্যাচিউরিটি অনুযায়ী ৫-৭ মি.মি. পরিমাণ ইনসিশন দেয়ার প্রয়োজন হয়। এই অপারেশনেও সাধারণত সেলাই প্রয়োজন হয় না। অভিজ্ঞ সার্জনের হাতে এই অপারেশনের ফলাফলও খুব ভালো।

ইসিসিই : তুলনামূলক পুরনো ছানি অপারেশন। এই অপারেনে ৯ -১১ মি.মি. ইনসিশন দিয়ে লেন্সটি বের করা হয় এবং পরিষ্কার করে কৃত্রিম লেন্স বসানো হয়। এই অপারেশনে ৪-৮ টি সেলাইয়ের প্রয়োজন হয়। সঠিকভাবে অপারেশন করা গেলে এই পদ্ধতিতেও রোগী ভালো দেখবেন। তবে সেলাইয়ের কারণে অনেকের চোখে কাঁটা কাঁটা লাগতে পারে বা এলার্জি হতে পারে।