সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

গেঁটেবাত উপশমে ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণ

গেঁটেবাত উপশমে ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণঅপুষ্টির পাশাপাশি অতিপুষ্টির কারণেও শরীরে রোগের সৃষ্টি হয়। কোনো একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান খুব বেশি গ্রহণের ফলে একটি নির্দিষ্ট সীমার পর সেই উপাদানটি উপকার না করে বরং দেহের ক্ষতি করতে শুরু করে। তেমনি একটি উপাদান হলো প্রোটিন। অতিরিক্ত মাংসাশী যারা, অর্থাৎ যারা প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন বা রিচ ফুড বেশি খান, অতিরিক্ত প্রোটিন তাদের শরীরে কিছু বিষাক্ত উপাদানের পরিমাণ বাড়িয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

মাত্রাতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের ফলে দেহে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে শরীরের টিস্যু ও জয়েন্টগুলোতে ক্রিস্টাল আকারে ইউরিক এসিড জমা হয় এবং জয়েন্টগুলো লালাভ হয়ে ফুলে যায়। সেই সাথে শুরু হয় প্রচণ্ড ব্যথা। সাধারণ মানুষের কাছে এ রোগ গেঁটেবাত হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার খেলেও দেহে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কেননা পিউরিন ভেঙে ইউরিক এসিড তৈরি হয়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, লিভারের রোগের মতো শরীরে ইউরিক এসিড জমা হওয়াও এমন একটি রোগ, যা শুধু খাবারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সাধারণ পুরুষের ক্ষেত্রে রক্তে ২.১-৮.৫ মি.গ্রা/ডিএল এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ২.০-৬.৬ মি.গ্রা/ডিএল ইউরিক এসিড থাকে। ইউরিক এসিডের মাত্রা এর থেকে বেড়ে গেলে তা পায়ের বুড়ো আঙুল, গোড়ালি, হাঁটু, কব্জি, কনুই ও আঙুলে জমা হতে শুরু করে। প্রোটিন ও পিউরিনজাত খাবার গ্রহণ করলে লিভারে গিয়ে ইউরিক এসিড তৈরি হয় এবং তা পরে কিডনির মাধ্যমে মূত্রের সাথে বের হয়ে যায়। কিন্তু লিভারে সমস্যা থাকলে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিক এসিড তৈরি হয় এবং কিডনিতে সমস্যা থাকলে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম ইউরিক এসিড দেহ থেকে নির্গত হয়। ইউরিক এসিড দেহের বর্জ্য পদার্থ বলে তা শরীরে জমতে থাকলে শরীরের ক্ষতি করে। কিডনিতে জমা হয়ে এটি পাথর সৃষ্টি করে। ফলে অনেক সময় কিডনি ও মূত্রথলির মাঝে যোগাযোগ রক্ষাকারী নালী ইউরেটার বন্ধ হয়ে মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, পানিশূন্যতা, অতিভোজন, গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড গ্রন্থির অতিসক্রিয়তা এবং বংশগত কারণেও দেহে ইউরিক এসিড বেড়ে যায়।

রক্তে ইউরিক এসিডের অতিমাত্রার ফলে সৃষ্ট অবস্থাকে হাইপারইউরেসেমিয়া বলে। তবে হাইপারইউরেসিমিয়া হলেই যে গেঁটেবাত হবে এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীতে এক লাখ লোকের মধ্যে ৮৪০ জন ইউরিক এসিডজনিত গেঁটেবাতে ভোগে। এ ছাড়া যারা অতিরিক্ত মদ্যপান করেন এবং স্থূল, তাদের শরীরে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। প্রোটিন ও পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার পরিমাণমতো খেলে ইউরিক এসিডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। উচ্চ প্রোটিন ও পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার কম খেলে ইউরিক এসিড এড়ানো সম্ভব।

আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন কিছু খাবার চিহ্নিত করেছে, যা বেশি খেলে দেহে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। খাবারগুলো হলো মদ, বিয়ার, কোমল পানীয়, ঈষ্ট, কলিজা, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, গুর্দা, শূকর, খাসির গোশত, ফিজেন্ট পাখি, মিষ্টি রুটি, বাছুরের গোশত, টুর্কি মুরগি (গলা ছিলা মুরগি), শিম, বরবটি, মটরশুটি, বিচিজাতীয় সবজি, মাশরুম, পালংশাক, এসপারাগাস, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গোশতের নির্যাস, পাতলা স্যুপ, গোশতের ঝোল, চিংড়িমাছ, কাঁকড়া, ভাজা খাবার; যেমন বাদাম ভাজা, কলে ছাঁটা সাদা আটা, কিছু সামুদ্রিক মাছ যেমন হেরিং মাছ, ঝিনুক, এনকোভিজ মাছ, মাসেল মাছ, ছোট মাছ যেমন সার্ডিন মলা, ঢেলা, চিনি, কফি প্রভৃতি।

১২ বছর ধরে ৭৩০ জন মানুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, যারা বেশি গোশত খান, তারা কম গোশতভুকদের চেয়ে ৪০ ভাগ বেশি আক্রান্ত হন ইউরিক এসিড দ্বারা। ইউরিক এসিড বছরের পর বছর বেশি পরিমাণে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশ করে না। খাবার নিয়ন্ত্রণ করলে ইউরিক এসিড সমস্যা সৃষ্টি করে না। কিছু খাবার আছে, যা ইউরিক এসিড কমাতে সাহায্য করে। জটিল শর্করা যেমন ভাত, আলু, পাস্তা, কালোজাম, ব্রোকলি খেলে ুধা কম লাগে এবং ওজন কমতে সাহায্য করে। অসম্পৃক্ত ফ্যাটে এমন একটি উপাদান আছে, যা ইউরিক এসিডজনিত গেঁটেবাত ও প্রদাহ কমায়। এগুলো হলো তৈলাক্ত মাছ; যেমন স্যালমন, টুনা মাছ, তিমির তেল, বাদাম, এভোকেন্ডো, অলিভ অয়েল। সম্পৃক্ত চর্বি যেমন ঘি, ডালডা প্রভৃতি ত্যাগ করতে হবে। ভিটামিন সি ও খনিজ লবণসমৃদ্ধ খাবার যেমন স্ট্রবেরি, লিচু, কমলা, সেলেরি, কালো ও লাল চেরিফল, আনারস ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমায়।

ইউরিক এসিড আক্রান্ত রোগীকে ওজন কমাতে হবে। তবে দ্রুত ওজন কমালে বা উপোস থাকলে ইউরিক এসিডের পরিমাণ না কমে বেড়ে যায়। এসব রোগীকে প্রাণিজ প্রোটিন অর্থাৎ মাছ-গোশত না খেয়ে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন যেমন মসুর ডাল, শাকসবজি খেতে হবে। শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এমন বর্জন করতে হবে। আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এ বিষয়ে প্রতিটি শ্রেণীর খাবার থেকে কতটুকু ক্যালরি আসা উচিত, তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। জটিল শর্করা যেমন ভাত, ফল, সবজি থেকে ১৫ শতাংশ এবং প্রোটিনজাত যেমন চর্বিহীন গোশত, মুরগির গোশত, উদ্ভিজ প্রোটিন থেকে ১৫ শতাংশ ক্যালরি আসতে হবে। চর্বি থেকে ৩০ শতাংশ ক্যালরি আসতে হবে এবং এর মধ্যে ১০ শতাংশ ক্যালরি আসবে প্রাণিজ চর্বি থেকে। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খেতে হবে। এতে শরীর থেকে ইউরিক এসিড নির্গত হয়।