সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ৪ ফেব্রুয়ারি। প্রতি বছর এ দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এ বছর বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় : Together it is possible. মানে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ব্যক্তি, সংস’া, সরকার, সবাই মিলে একতাবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলে ক্যান্সার প্রতিরোধ সহজ হয়ে যাবে। এবার বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হার শতকরা ২৫ ভাগ কমিয়ে আনতে হবে।

এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে কার্যকর ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম তৈরি করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ক্যান্সার প্রতিরোধে আরো যেসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, তামাক এবং তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। একই সাথে অ্যালকোহল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বাস্তবায়নে ক্যান্সার প্রতিরোধ প্রোগ্রামকে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ভ্যাকসিন প্রোগ্রাম, উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস’া, কার্যকর বেদনানাশক এবং মেডিক্যাল স্টাফদের যথাযথ প্রশিক্ষণদানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এ বছর। উল্লেখ্য, ২০০৮ সাল থেকে বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘ক্যান্সার প্রতিরোধ প্রোগ্রাম’।

২০০৮ সালে বলা হয়েছিল, ‘Give children and young people a snokefree movement’.
এমনিভাবে ২০১০ সালে স্লোগান ছিল, ‘Cancir can be prevented too.’ 2011 mv‡j †¯øvMvb wQj, ‘Prevention is key.’

আমরা জানি, ক্যান্সার প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক হিসাব অনুযায়ী খাদ্যজনিত ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার ৩৫-৪০ ভাগ। অন্য দিকে তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ৩০-৩৫ ভাগ। যৌনাচারজনিত ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার ৭-৮ ভাগ। অ্যালকোহলজনিত ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার ২-৩ ভাগ। সুতরাং ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা। ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল। কিন’ প্রতিরোধ প্রোগ্রাম সাশ্রয়ী। এই প্রতিরোধ প্রোগ্রাম জোরদার করার মাধ্যমে ক্যান্সার রোগ ২০২৫ সাল নাগাদ ২৫ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস’্য সংস’ার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১২ মিলিয়ন লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৭.৬ মিলিয়ন লোক প্রতি বছর ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে। বিশ্বস্বাস’্য সংস’ার মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৪ মিলিয়ন লোক ক্যান্সারে মারা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস’্য সংস’ার আশাবাদ হচ্ছে, শতকরা প্রায় ৪৩ ভাগ ক্যান্সার সত্যিকার অর্থে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেগুলো হচ্ছে- পাকস’লীর ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, মলান্তের ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ : বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এক হিসাব মতে, ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ, এর সাথে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন রোগী যোগ হচ্ছে। মারা যাচ্ছে প্রতি বছর দেড় লাখ ক্যান্সার রোগী (বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি সূত্রে প্রাপ্ত)। অন্য এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সার (২৪.৭%) বেশি। মহিলাদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার (২৪.৬%) বেশি। মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যান্সারের পরের অবস’ানে রয়েছে স্তন ক্যান্সার (২৪.৩%)। এসব তথ্য ২০০৫ সাল পর্যন্ত (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ, ঢাকা)। তবে যেসব কারণে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে- ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। বিশ্ব স্বাস’্য সংস’ার মতে, সিগারেট বা তামাকে চার হাজার রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে। তার মধ্যে ৪৩টিই ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। ধূমপান শুধু ধূমপানকারীর শরীরেই ক্যান্সার সৃষ্টি করে না, পরোক্ষভাবে ধূমপায়ীর আশপাশের লোকদের মধ্যেও ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ধূমপানে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে তা তেমন কার্যকর নয়। এ আইনটি কঠোরভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন।

ক্যান্সার প্রতিরোধে শিক্ষা : ক্যান্সার প্রতিরোধের মূল অ্যাজেন্ডা জনসচেতনতা। প্রচারমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি সংস’া, এনজিও, সমাজকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষভাবে ধূমপান প্রতিরোধে তারা জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। জরায়ুমুখ ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সামাজিক সংস’াগুলোর জনশক্তিকে পরিকল্পনানুযায়ী প্রশিক্ষণ দিলে তারা এতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন। যেমন- জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে বল্যবিয়ে এবং যৌনাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে নিজে নিজেই স্তন পরীক্ষার বিষয়টি বিভিন্ন স্তরের মাহিলাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার এবং প্রশিক্ষণ দেয়া।

ক্যান্সারের সতর্ক লক্ষণ : প্রাথমিকভাবে ক্যান্সার ধরা পড়লে তা আরোগ্যযোগ্য। এ জন্য ক্যান্সারের সাতটি সতর্ক লক্ষণ সবাইকে জানতে হবে।
(১) পায়খানা-প্রস্রাবের অভ্যাসের পরিবর্তন, (২) কোনো ক্ষত না শুকানোর প্রবণতা, (৩) অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, (৪) স্তনে কোনো শক্ত দলা অথবা শরীরের অন্য কোনো জায়গায় শক্ত পিণ্ড বর্তমান থাকা, (৫) পেটের অজীর্ণতা কিংবা ঢোক গিলতে অসুবিধা, (৬) আঁচিল বা তিলের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন, (৭) বিরক্তিকর অবিরত কাশি কিংবা গলা বসে যাওয়ায় প্রবণতা।
ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয় : ০১। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা, ০২। প্রতিদিন ব্যায়াম করা কিংবা এক ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস, ০৩। কোলাপানীয় ও চিনিসমৃদ্ধ পানীয় বর্জন করা, ০৪। লাল গোশত (গরু, ছাগল, মহিষ) গ্রহণ এবং কৃত্রিমভাবে সংরক্ষিত খাবার পরিহার করা, ০৫। উদ্ভিজ্জ খাবার ও ফলফলাদি বেশি বেশি খাওয়া, ০৬। মদপান বর্জন করা, ০৭। লবণ কম খাওয়া, ০৮। আগুনে ঝলসানো মাছ, গোশত, গ্রিল, শিক কাবাব পরিহার করা, ০৯। ধূমপান, তামক-জর্দা বর্জন করা, ১০। মানসিক চাপমুক্ত থাকা এবং ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলা।

পাঁচটি অভ্যাস জরুরি :

০১। অধিক হারে টাটকা শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সবুজ, হলুদ ও পাতা জাতীয় শাকসবজি অন্ত্র, পায়ুপথ, প্রোস্টেট, পাকস’লী, শ্বাসযন্ত্র, স্তন এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
০২। অধিক আঁশ জাতীয় খাবার গ্রহণ করুন। আঁশ জাতীয় খাবার অন্ত্র ও পায়ুপথে ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
০৩। ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার বেশি গ্রহণ করুন। মুখ, অন্ননালী, শ্বাসনালী, পাকস’লী, অন্ত্র, পায়ুপথ, প্রস্রাবথলি এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
০৪। ভিটামিন ‘সি’ জাতীয় খাবার অধিক গ্রহণ করুন। মুখ, অন্ননালী, অন্ত্র, পাকস’লী, পায়ুপথ এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
০৫। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন। অন্ত্র, জরায়ু, পিত্তথলি এবং স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা রোধ করে।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ : ক্যান্সার প্রতিরোধ কার্যক্রমে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণকে এ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বসহ সব শ্রেণীর জনগণকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় ক্যান্সার প্রতিরোধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষভাবে চিকিৎসক সমাজ এ কার্যক্রমে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠিত অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকদের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি, ইউনানি, আয়ুর্বেদি ও হারবাল চিকিৎসকদেরও গুরুত্বের সাথে এ প্রতিরোধ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : ডা: জি এম ফারুক, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যান্সার সোসাইটি