সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি

বাংলাদেশে ক্যান্সার একটি অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির মতে, দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্যান্সারে ভুগছেন। পুরুষ রোগীর মধ্যে ফুসফুস, স্বরযন্ত্র, মুখ ও মুখগহ্বর, পরিপাকতন্ত্র এবং মহিলাদের জরায়ুমুখ, স্তন, ডিম্বাশয়, মুখ ও মুখগহ্বর, পিত্তথলি প্রভৃতি প্রধান প্রধান ক্যান্সার সমস্যা। শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, রেটিনোব্লাস্টমা, ব্রেইন টিউমার, মারকোমা প্রধান। এ দেশের আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে হাতুড়ে চিকিৎসা, কুসংস্কার, স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে রোগীরা সাধারণত রোগের তৃতীয় ও চতুর্থপর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে আসেন।

রেডিওথেরাপি ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতি। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি ক্যান্সার রোগীর এই চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে রেডিওথেরাপির চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়। যথা

  • ক্যান্সার নিরাময়ে শল্য চিকিৎসার পর অপারেশনের স্থানে যাতে ক্যান্সার কোষ আর জন্মাতে না পারে।  অনিরাময়যোগ্য রোগীর ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে।
  • রেডিওথেরাপি হচ্ছে আয়ন সৃষ্টিকারী এক অদৃশ্য শক্তি, যা ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করে। আয়ন সৃষ্টিকারী এই অদৃশ্য শক্তিগুলো হচ্ছে এক্স-রে, গামা-রে ও পরমাণু খণ্ডিত অংশ যেমনÑ ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন।
  • রেডিওথেরাপির সোর্স বা উৎস হলো :
  • লিনিয়র এক্সিলারেটর মেশিন, যা থেকে বিভিন্ন শক্তিমাত্রার এক্স-রে, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন তৈরি হয়।
  • তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেমন কোবাল্ট ৬০, সিজিয়াম ১৩৭, ইরিডিয়াম ১৯২ প্রভৃতি। এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে গামারশ্মি বেরিয়ে আসে। Ÿ ডিপ এক্স-রে মেশিন।

অপেক্ষাকৃত কম শক্তিমাত্রার এক্স সৃষ্টি হয়। বর্তমানে রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় এই মেশিনের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে।
১. টেলিথেরাপি। একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে শরীরের ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে চিকিৎসা প্রদান করা। এই টেলিথেরাপি চিকিৎসার মেশিনকে বলা হয় টেলিথেরাপি মেশিন।
উদাহরণ : লিনিয়র এক্সিলারেটর, কোবাল্ট ৬০ টেলিথেরাপি মেশিন।
২. ব্র্যাকিথেরাপি। ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে সরাসরি তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রয়োগ করে রেডিওথেরাপি প্রদান। ব্র্যাকিথেরাপি বিভিন্ন শক্তিমাত্রার হয়ে থাকে। যেমন উচ্চ মাত্রার, মধ্যম মাত্রার ও নিম্নমাত্রার। রেডিওথেরাপির সম্পূর্ণ চিকিৎসা অনেক ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে প্রদান করা হয় (আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী)। তাই বেশ সময় ধরে টেলিথেরাপি চিকিৎসা হয়ে থাকে। সপ্তাহে পাঁচ দিন করে চার সপ্তাহ থেকে ছয় সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় একটানা চিকিৎসা চলে। যদিও চিকিৎসার সময় খুবই কম, এক মিনিটেরও কম সময় থেকে কয়েক মিনিট মাত্র। তবে অনিরাময়যোগ্য রোগীর জন্য ব্যথা কমানো ও অন্যান্য উপসর্গের উপশমের জন্য অল্প সময়ব্যাপী রেডিওথেরাপি চিকিৎসা হয়ে থাকে।

ব্র্যাকিথেরাপি চিকিৎসায় সময় নির্ভর করে এর শক্তিমাত্রার ওপর। ব্র্যাকিথেরাপি চিকিৎসা সাধারণত টেলিথেরাপি চিকিৎসার সাথে সমন্বয় করে করা হয়।
টেলিথেরাপি চিকিৎসার মধ্যে অথবা চিকিৎসা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্র্যাকিথেরাপি প্রদান করা হয়। ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন উচ্চমাত্রাযুক্ত হলে খুব অল্প সময়ে চিকিৎসা করা যায়, তবে প্রয়োজনীয় মাত্রার জন্য বেশ কয়েকবার ব্র্যাকিথেরাপি প্রয়োগ করার দরকার হয়। নিম্নমাত্রার হলে চিকিৎসার সময় ২০-২৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি। তবে প্রয়োজনীয় মাত্রা প্রয়োগ করার জন্য ১-২ বার ব্র্যাকিথেরাপিই যথেষ্ট।
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা যথাযথভাবে প্রয়োগ করার জন্য আরো কিছু সাহায্যকারী মেশিন ও অন্যান্য আয়োজন থাকা জরুরি।

সাইমুলেটর : রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সঠিকভাবে স্থান নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত মেশিন।
কর্ডপিউটর প্লানার : রেডিওথেরাপি ডোজ বিন্যাস ও ট্রিটমেন্ট প্লানিং করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
রোগীকে চিকিৎসার সময় স্থির রাখার ব্যবস্থা। কারণ রেডিওথেরাপি চিকিৎসা ধাপে ধাপে প্রদান করা হয়। প্রতিদিনের প্রতিটি চিকিৎসা একইভাবে একই অবস্থায় প্রদান করার লক্ষ্যে চিকিৎসার স্থান স্থির রাখায় ব্যবহার করা।
রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে রেডিওথেরাপি ডোজ/চিকিৎসামাত্রা যথোপযুক্ত প্রয়োগ করার  ওপর। অর্থাৎ উপযুক্ত ডোজ বা চিকিৎসামাত্রা যা দ্বারা ক্যান্সার কোষ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হবে কিন্তু স্বাভাবিক কোষের ক্ষতি হবে খুবই সামান্য।
চিকিৎসামাত্রা বেশি হলে এই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হবে ও রোগীর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আবার প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে রেডিওথেরাপি কম প্রয়োগ হলে ক্যান্সার কোষ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পরে থেকে যাওয়া ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি পেয়ে রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
রেডিওথেরাপি একটি দলীয় চিকিৎসা। এই চিকিৎসা টিমের প্রধান এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট।

রেডিওথেরাপি চিকিৎসার তিনটি অংশ। প্রথমত, রেডিওথেরাপি চিকিৎসার প্লানিং অর্থাৎ চিকিৎসার পরিকল্পনা। রোগী, চিকিৎসার স্থান, রেডিওথেরাপির  ডোজ, মেশিন নির্বাচনসহ অন্য অনেক বিষয় বিবেচনা করে এই চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়। রেডিওথেরাপি বিষয়ে রোগীর সার্বিক দায়িত্ব চিকিৎসকের।
দ্বিতীয়ত : রেডিওথেরাপি মেশিন ও অন্যান্য মেশিন সচল রাখা। প্রোগ্রাম করা রেডিওথেরাপি ডোজ রোগীর শরীরে যথাযথভাবে প্রয়োগের ব্যাপারটি নিশ্চিত করা। মেশিন থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় রশ্মি, তেজস্ক্রিয় পদার্থ ও রেডিওথেরাপি মাত্রা পরিমাপ করা, রেডিয়েশন ওয়ার্কার ও মেশিনের কাছাকাছি আসা সংশ্লিষ্টদের রেডিয়েশন প্রতিরোধ বিষয়ে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি হলে মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট। তাই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নীতি অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে রেডিওথেরাপি মেশিন পরীক্ষা করতে হয়। রেডিওথেরাপি যন্ত্রে কখনো কোনো কারণে ত্রুটি দেখা দিলে সাথে সাথে তা সরানোর ব্যবস্থা রাখা, যাতে রোগীরা রেডিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে এসে কোনো ক্ষতির মুখোমুখি না হন।

তৃতীয়ত : মেশিন অপারেট করে পূর্বনির্ধারিত মাত্রার চিকিৎসা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। মেশিন অপারেট করার দায়িত্ব মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের।
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা হচ্ছে এই তিন ধরনের কাজের সমন্বয়। ভালো ট্রিটমেন্ট প্লানিং, সচল, ত্রুটিহীন মেশিন ও মেশিন পরিচালনায় দক্ষতাই দিতে পারে যথোপযুক্ত চিকিৎসা প্রদানের নিশ্চয়তা।