সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

ক্যান্সারের সতর্ক লক্ষণ ও প্রতিরোধ

ক্যান্সারের সাতটি সতর্ক লক্ষণ
১. পায়খানা-প্রস্রাবের অভ্যাসের পরিবর্তন।
২. কোনো ক্ষত না শুকানোর প্রবণতা।
৩. অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ।
৪. স্তনে কোনো শক্ত দলা অথবা শরীরের অন্য কোনো জায়গায় শক্ত পিণ্ড বর্তমান থাকা।

৫. পেটের অজীর্ণতা কিংবা ঢোক গিলতে অসুবিধা।
৬. আঁচিল বা তিলের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন।
৭. বিরক্তিকর অবিরত কাশি কিংবা গলা বসে যাওয়ার প্রবণতা।
পাঁচটি অভ্যাস ত্যাগ করুন
১. উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কারণ চর্বিযুক্ত খাবার স্তন, অন্ত্র এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
২. ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। ধূমপানে সর্বাধিক ক্যান্সার সৃষ্টি হয়।
৩. জর্দা, সাদাপাতা, তামাক সেবন বন্ধ করুন। কারণ এগুলো মুখ, মাঢ়ি এবং গলনালীর ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
৪. মদ পানে বিরত থাকুন। কারণ এর দ্বারা লিভার ও পাকস’লীর ক্যান্সার হতে পারে।
৫. আচার, কাসুন্দি, শুঁটকি এবং লবণ দেয়া মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ এর দ্বারা অন্ননালী ও পাকস’লীর ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি লক্ষণ
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের সাথে জীবনযাত্রার সম্পর্ক বিদ্যমান। যারা তামাকজাত দ্রব্য যেমন- জর্দা, সাদাপাতা, গুটকা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত, তাদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি। যাদের যৌনজীবন ১৬ বছরের আগে, যাদের প্রথম গর্ভ ১৮ বছরের নিচে, যাদের অধিক সন্তান, গর্ভরোধক পিল খাওয়ার ইতিহাস এবং বহুগামী নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি বিদ্যমান। ঝুঁকিপূর্ণ অবস’ার মূল্যায়নে প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা ১৮ বছর বয়স থেকে প্রতিবছর পেপ টেস্ট এবং পেলভিক পরীক্ষা করানো উচিত। যদি পরপর তিন বছর পরীক্ষার ফলাফল ভালো থাকে, তারপরে প্রতিবছর পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।

পাকস’লীর ক্যান্সার প্রতিরোধে করণীয়
পাকস’লীর ক্যান্সার প্রতিরোধে ভিটামিন এ, ই, সেলেনিয়াম এবং বিটাকেরোটিনযুক্ত খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। ধূমপায়ীদের ধূমপান বন্ধ করতে হবে এবং প্যাসিভ স্মোকিং-এর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যাদের মদপানের অভ্যাস আছে, তারা তা পরিহার করবেন। আচার, কাসুন্দি, শুঁটকি এবং লবণ দেয়া মাছ গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। অধিক হারে টাটকা শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন।

আঁশজাতীয় খাবার ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
আঁশজাতীয় খাবার অন্ত্র, পায়ুপথ ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এ জন্য লাল আটা, গম, চাল, শস্যদানা, ভুট্টা, গোলআলু, মটরশুঁটি, কিসমিস, আপেল, কমলা, টমেটো ইত্যাদি জাতীয় খাবার অধিক হারে গ্রহণ করুন।

ভিটামিন ‘এ’ যেসব ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার মুখ, অন্ননালী, শ্বাসনালী, পাকস’লী, অন্ত্র, পায়ুপথ, প্রস্রাবথলি এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার যেমন- ডিমের কুসুম, দুগ্ধজাতীয় খাবার, মাছ, কলিজা, টাটকা ফলফলাদি এবং সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়।

ব্রেস্ট ক্যান্সার যাদের বেশি হয়
ব্রেস্ট ক্যান্সারের নিশ্চিত কারণ অজানা। তবে জেনেটিক কারণ অন্যতম। যেসব পরিবারের নিকটাত্মীয়দের অন্তত দুজনের ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগের ইতিহাস থাকে, তাদের চার থেকে ছয় গুণ বেশি সম্ভাবনা থাকে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার। এ ছাড়া যাদের অল্প বয়সে মাসিক শুরু (১২ বছরের নিচে), অধিক বয়সে (৫০ বছরের পরে) রজঃনিবৃত্তি (Menopause), অধিক বয়সে প্রথম গর্ভধারণ (৩০ বছরের পরে), যারা নিঃসন্তান, অধিক সময় গর্ভনিরোধক বড়ি সেবন, হরমোন থেরাপি গ্রহণ, স’ূলতা, অ্যালকোহল সেবন ইত্যাদি কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে অধিক চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। ফলমূল বেশি খেতে হবে। সবুজ শাকসবজি খেতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে।

আপেল ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
প্রতিদিন একটি আপেল এবং শাকসবজিসমৃদ্ধ খাবার কোলোন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চ। গবেষকেরা বলেছেন, আপেলে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- প্রোসায়ানিডিনস (Procyanidins), যা ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে পারে। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, আপেল ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধে আপেল সম্পর্কে একটি প্রবাদ আছে- An apple a day may keep the doctor away.

পেঁপে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
পেঁপের ঔষধি গুণাবলির শেষ নেই। এর ফুল, ফল, গাছ, মূল সব কিছুরই ঔষধি গুণাবলি রয়েছে। সমপ্রতি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন (মে-২০১১) জানিয়েছে, পেঁপে ব্রেস্ট ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে। কারণ পেঁপেতে রয়েছে প্রচুর লাইকোপেন , যা ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। আরেক গবেষণায় জানা যায়, পেঁপে প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। এ ছাড়া পেঁপে পাতার নির্যাসও ক্যান্সার প্রতিরোধক এবং এর দ্বারা ক্যান্সার নিরাময়ের কথাও বলছেন গবেষকেরা।

অলিভ অয়েল ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
অলিভ অয়েলের ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভিন্ন গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত। অলিভ অয়েল যেসব ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে- ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ওভারিয়ান ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার ও স্কিন ক্যান্সার। অলিভ অয়েলের প্রধান উপাদান অলিক অ্যাসিড (Oleic acid) ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে থামিয়ে দিতে পারে। এ জন্য আমরা নিয়মিত সালাদের সাথে, রান্নায় কিংবা সরাসরি অলিভ অয়েল খেতে পারি। অলিভ অয়েল এক্সট্রা ভার্জিন ও ভার্জিন ব্র্যান্ডটি খাবারে বেশি ব্যবহৃত হয়।

ডালিম ক্যান্সার প্রতিরোধক
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডালিমের ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। বিশেষভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার ও প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে ডালিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডালিম বীজে প্রচুর পিউনিসিক অ্যাসিড (Punicic acid) থাকে, যা ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। ফল হিসেবে ডালিম আমাদের কাছে বেশ রুচিকর। নিয়মিত যারা ডালিম খাবেন তারা বেশ উপকার পাবেন।

গ্রিন টি মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
আমরা অনেকেই চা পানে অভ্যস্ত। চায়ের একটি প্রকার হচ্ছে গ্রিন টি। এই গ্রিন টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হচ্ছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সয়াবিন ও হলুদ ক্যান্সার প্রতিরোধকারী
সয়াবিনে বিদ্যমান সয়া আইসোফ্ল্যাভোন এবং হলুদে বিদ্যমান কুরকুমিন ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টরের কার্যকারিতা বন্ধ করে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এ কারণে যারা সয়াবিন ও হলুদ যৌগভাবে ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার কম হয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে নিজেই নিজের পরীক্ষা
কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধে নিজেই নিজের পরীক্ষা করে জানতে পারা যায় শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধছে কি না। প্রথমত, মেয়েদের স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে মাসিক শেষ হওয়ার পরপরই একটি নির্দিষ্ট দিনে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করতে হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা গোসলের সময় অথবা বিছানায় শুয়ে এ পরীক্ষা করা যায়। পরীক্ষায় ব্রেস্টে কোনো চাকা বা কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকলে সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, ব্রেস্টে চাকা মানেই কিন’ ক্যান্সার নয়।

এমনিভাবে চামড়ায় কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা জানার জন্য রয়েছে স্কিন সেলফ এক্সামিনেশন (SSE)। আবার পুরুষের অণ্ডকোষে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা জানার জন্য রয়েছে টেস্টিকুলার সেলফ এক্সামিনেশন (TSE)। এসব সহজ পরীক্ষা দ্বারা নিজেই নিজের অবস’া সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সম্ভব হয়। এসব পরীক্ষা নিকটস’ কোনো স্বাস’্যকেন্দ্র অথবা ব্যক্তিগত চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে।