সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

কিডনি যখন বিকল

কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়াকে কিডনি বৈকল্য বা কিডনি  ফেইলিউর বলা হয়। কিডনি বৈকল্য দুই প্রকার, যথা-

১. আকষ্কিক কিডনি বৈকল্য বা একিউট রেনাল ফেউলিউর অর্থাত্ হঠাত্ করে কিডনি কাজ বন্ধ করে দেওয়া।

২. ধীরগতি কিডনি বৈকল্য বা ক্রনিক রেনাল ফেইলিউর – অর্থাত্ কিডনি ধীরে ধীরে এবং স্থায়ীভাবে কার্যকারিতা হারায়। কিডনি যখন স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না তখন শরীরের বর্জ্য এবং অতিরিক্ত পানি জমতে থাকে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের জন্য কিডনি ফেইলর হয়ে থাকে। এছাড়া কিডনিতে আঘাত, সংক্রামণ, জন্মগত ক্রটি, রাসায়নিক পদার্থ, ওষুধ, রক্তনালীর সমস্যা প্রভৃতি কারণে কিডনি বৈকল্য হয়ে থাকে। কিডনি বৈকল্য হতে পারে অস্থায়ী অথবা স্থায়ী।

উভয় প্রকারের জন্যই নানাবিধ চিকিত্সা রয়েছে। কিডনি হচ্ছে দুটি সীমের বিচি আকৃতির অঙ্গ যা মেরুদন্ডের দুপাশে বক্ষ পাজরের নীচে অবস্থিত। কিডনির মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হলে কিডনি রক্ত ছেকে প্রস্রাব তৈরী করে। প্রস্রাবের সাথে শরীরের বর্জ বের করে দেয় এবং প্রয়োজনীয় লবণ ও পানি শোষণ করে। যে কোনো কারণে কিডনিতে রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হলে, প্রস্রাব দেহ হতে বের হতে না পারলে কিডনি বৈকল্য হয়।

কিডনি বৈকল্যের তিনটা পর্যায়ে রয়েছে।

  • আকস্মিক কিডনি বৈকল্য (Acute renal failure)
  • ধীরগতি কিডনি বৈকল্য (Chronic renal Failure)
  • চুড়ান্ত কিডনি বৈকল্য (End-stage renal failure)

কিডনি বৈকল্য দেখা দিলে কিডনি শরীরের বর্জ্য এবং পানি বের করতে পারে না ফলে কিডনি বৈকল্যের উপসর্গ এবং লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। এন্ড ষ্টেজ রেনাল ফেইলিউর হচ্ছে ক্রনিক রেনাল ফেইলরের চুড়ান্ত অবস্থা এবং ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তা চিকিত্সা করতে হয়।

রোগের লক্ষণ সমূহ

কিডনি বৈকল্যের জন্য সাধারণত বমির ভাব এবং বমি হয়। তাছাড়া অন্যান্য লক্ষণ সমূহ রোগের পর্যায় ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে-

  • আকস্মিক কিডনি বৈকল্য: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, ঝিমুনী, মাথা ব্যথা, পিঠে ব্যথা হতে পারে
  • ধীরগতি কিডনি বৈকল্য: দূর্বলতা অনুভব, ক্ষুধা মন্দা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া বিশেষ করে রাতের বেলায়, ফ্যাঁকাশে,  চুলকানী চামড়ায় সহজেই ক্ষত হয়, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, অবিরাম হিক্কা, মাংস পেশীর  সংকোচন, হাত-পায়ে পিন ফোটানো অনুভূতি, এমনকি হাত-পায়ের খিচুনী হতে পারে।
  • চুড়ান্ত কিডনি বৈকল্য: প্রস্রাবের পরিমাণ অত্যান্ত কম হওয়া, মুখমন্ডল, পা এবং পেট ফোলা, প্রচন্ড দূর্বলতা, মাথা ব্যথা, জিহবাতে আবরণ পড়া, চামড়ায় অতিরিক্ত চুলকানী এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে ঝাঁঝালো এমোনিয়ার গন্ধও পাওয়া যেতে পারে। এ পর্যায়ে রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া বাচানো সম্ভব হয় না।

রোগের কারণ সমূহ

সাধারণ ভাবে বলা যায়, কিডনিতে রক্ত চলাচল কমে গেলে কিডনি পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত ছাকতে পারে না ফলে কিডনি ফেইল করে। নিদিষ্ট কারণ সমূহ নিম্নরূপ – কিডনির রক্তনালীর অসুখ, যেমন-রক্তনালী শুকিয়ে শক্ত হওয়া, প্রস্রাবের নালী বন্ধ হয়ে যাওয়া, রক্তনালীর অপারেশন, আঘাত জনিত কারণে, কিডনিতে জীবানু সংক্রামণ ও কিডনি প্রদাহ বা নেফ্রোইটিস, এলার্জী এবং কিডনির নানা প্রকার অসুখ।

ঝুঁকিপূর্ণ কারণ সমূহ

  • ডায়াবেটিস
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • দীর্ঘদিন ব্যথা নাশক ওষুধ সেবন
  • সিকল সেল রক্ত শুন্যতা
  • মাদকাসক্তি

রোগ নির্ণয়

কিডনি বৈকল্য নির্ণয়ের জন্য রক্তের নিম্নলিখিত পরীক্ষা সমূহ করা হয়-

  • প্রস্রাব পরীক্ষা (প্রস্রাবে অতিরিক্ত আমিষ যায়)
  • ক্রিয়েটিনন ( উচ্চমাত্রায় বিদ্যমান থাকে)
  • ইউরিয়া নাইট্রোজেন (অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া এবং নাইট্রোজেন রক্তে পাওয়া যায়)
  • ইলেক্ট্রলাইটস (রক্তে পটাসিয়াম বেড়ে যায় এবং সোডিয়ামের মাত্র কমে যায়)

কিডনি বৈকল্যের কারণ জানার জন্য প্রয়োজন অনুসারে নিম্নলিখিত পরীক্ষা গুলো করা হয়ে থাকে-

  • ডুপ্লেক্স আল্ট্রাসাউন্ড
  • রেডিওনিউক্লাইড স্ক্যান
  • কিডনি বায়োপসি
  • সিটি স্ক্যান
  • রেনাল আর্টরিও গ্রাফী
  • ম্যাগনেটিক রেজনেন্স এনজিওগ্রাফী

চিকিত্সা

সাধারণত একিউট রেনাল ফেইলিউরে কিডনির কার্যকারিতা আবার স্বাভাবিক এবং পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে, কিন্তু ক্রনিক রেনাল ফেইলিউর তা হয় না এবং আস্তে আস্তে এন্ড ষ্টেজ রেনাল ডিজিজে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

একিউট রেনাল ফেইলিউরের চিকিত্সা-

  • শিরায় এন্টিবায়োটিক বা জীবানু নাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হয়
  • অন্যান্য ওষুধ পত্র প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করতে হয়।
  • ডায়ালাইসিস- যদি উপরের চিকিত্সায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে না তখন ডায়ালিসিস                    (কৃত্রিম রক্ত পরিশোধণ) এর ব্যবস্থা করতে হয়।
  • যখন একিউট রেনাল ফেইলিউর স্থিতি অবস্থায় আসে তখন প্রকৃত কারণের চিকিত্সা করতে হবে।

ক্রনিক রেনাল ফেইলিউরের চিকিত্সা

  • প্রকৃত কারণের চিকিত্সা যেমন – ডায়াবেটিকস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে,
  • সীমিত আহার যেমন- কম পরিমাণে আমিষ, লবণ, পটাসিয়াম ইত্যাদি গ্রহণ করার উপদেশ দিতে হবে,
  • সীমিত পানি পান করা আবশ্যক, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান অধিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
  • রক্ত শূন্যতার চিকিত্সা করা একান্ত প্রয়োজন এবং এর জন্য আধুনিক ওষুধ পত্রের ব্যবস্থা যেমন -Mircera বা অন্যান্য ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

এন্ড ষ্টেজ রেনাল ফেইলিউরের চিকিত্সা

  • ডায়ালাইসিস(কৃত্রিম রক্ত পরিশোধন -যতদিন না কিডনি দাতা পাওয়া যায় ততদিন রোগীকে ডায়ালিসিস ব্যবস্থা করতে হতে পারে
  • কিডনি প্রতিস্থাপন (Renal Transplant) হলো এই রোগের সর্ব্বোত্তম চিকিত্সা ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে প্রতিস্থাপন  যোগ্য কিডনি রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংযোজন করা হয়। এই চিকিত্সা পদ্ধতির ফলাফল অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশী সন্তোষজনক।

লেখক: লেখক: প্রফেসর এম. এ. সালাম | প্রখ্যাত অনকো ইউরোলজিস্ট,  চেয়ারম্যান:ইউরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়