সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

উচ্চ রক্তচাপের অজানা কথা

ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্ত সর্বদা তীব্র গতিতে চলাচল করে। ধমনীর ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচলের সময় ধমনীর দেয়ালে যে চাপ প্রয়োগ করে তাকেই রক্তচাপ বলে। মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০-এর কম। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়াকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলে। সাধারণত রক্তচাপ ১৪০/৯০-এর সমান বা বেশি হলে তাকে হাইপারটেনশন বলে।

উচ্চ রক্তচাপের কারণ
কারণ অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। প্রাইমারি কারণ হলো যে কারণ এখনও অজানা। সিংহভাগ উচ্চ রক্তচাপের কারণ এখনও জানা যায়নি অর্থাত্ প্রাইমারি উচ্চ রক্তচাপ। অল্প কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কারণ জানা যায়। যেমন—কিডনির কিছু সমস্যা, হরমোনজনিত সমস্যা ইত্যাদি।

উচ্চ রক্তচাপের উপসর্গ
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা দেখা দিলে কেবল তখনই কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন—মাথা ব্যথা, বুক ধড়পড় করা, কিছুটা শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা হঠাত্ করে টলে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

উচ্চ রক্তচাপের আধুনিক চিকিত্সা
উচ্চ রক্তচাপের চিকিত্সা সাধারণত দুই ভাগে করা হয়—ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা এবং জীবন যাপনের পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিত্সা। বর্তমানে বাজারে বেশ কয়েক ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ বাংলাদেশে উত্পাদিত হয় বলে এসব ওষুধের দাম অনেক কম। তাছাড়া প্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত হওয়ায় এসব ওষুধ সারা জীবন গ্রহণ করলেও কোনো সমস্যা হয় না।

একেক জনের শারীরিক অবস্থাভেদে একেক ধরনের ওষুধ দেয়া হয়। তবে সবচেয়ে ভালো হলো জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা। এর মধ্যে রয়েছে চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার, কায়িক পরিশ্রম বাড়ানো, অহেতুক টেনশন কমিয়ে ফেলা, ধূমপান পরিহার, প্রচুর শাক-সবজি খাওয়া, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা ইত্যাদি। এসব কিছু করার পরও যদি হাইপারটেনশন না কমে তাহলে ওষুধ খাওয়া ছাড়া আর বিকল্প থাকবে না।

উচ্চ রক্তচাপ ও কিছু ভুল ধারণা

এক. অনেকে মনে করেন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ একবার খেলে সারা জীবন খেতে হবে, তাই ওষুধ খেতে চান না। এটা ঠিক নয়। কেননা, আপনার শরীর নিজে নিজে ব্যর্থ হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্যই ওষুধের সাহায্য নিতে হবে। অন্যথায় আপনি বিলম্ব করলেও বাড়তি রক্তচাপ আপনার ক্ষতিসাধন করতে মোটেও বিলম্ব করবে না।

দুই. কাঁচা লবণ খেলে প্রেসার বাড়ে, তাই লবণ ভেজে খাওয়া ভালো। এটাও একদম ভুল কথা। লবণ ভেজে খান আর তরকারিতে খান না কেন, মাথাপিছু প্রতিদিন গৃহীত লবণের পরিমাণ যেন ৬ গ্রাম বা পূর্ণ এক চামচের বেশি না হয়।

তিন. প্রেসার কমে গেলে ওষুধ ছেড়ে দেয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। এটাও একটা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। মনে রাখতে হবে, ওষুধ খেয়েই প্রেসার নিয়ন্ত্রণে আছে। তাই ওষুধ ছেড়ে দেয়া মানেই স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়া।

চার. একবার প্রেসার বেশি পাওয়া মানেই প্রেসারের রোগী। মোটেও নয়। পরপর তিন দিন সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় যদি প্রেসার বেশি পাওয়া যায় তবে ধরে নিতে হবে আপনার প্রেসার বেশি। নানা কারণে হঠাত্ একটু-আধটু প্রেসার বাড়তে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপের রোগী বলতে হলে প্রেসার পরপর তিন দিন মাপাতে হবে।

পাঁচ. ঘাড়ে ব্যথা মানেই প্রেসার। কখনোই না। কারণ নানা কারণে ঘাড়ে ব্যথা হয়। খুবই কম ক্ষেত্রে প্রেসারের আধিক্যে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা

উচ্চ রক্তচাপ নিজে যেহেতু কোনো উপসর্গ তৈরি করে না, তাই নীরবে এটি অনেক জটিলতার সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের ফলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইল্যুর অন্ধত্বসহ রক্তনালির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। এসব সমস্যায় কেউ আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষূ অবস্থায় যখন পতিত হন তখন জানতে পারেন তিনি আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।

উচ্চ রক্তচাপ ও হাইপারটেনশন সেন্টার

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের চিকিত্সা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথম এগিয়ে আসেন মরহুম অধ্যাপক ডা. এসজিএম চৌধুরী। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালে বেসরকারিভাবে প্রথম হাইপারটেনশন সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকায়। এখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে চিকিত্সা সেবা নিয়ে থাকেন। উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান অদ্যাবধি নানা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এর অনেক দিন পর ২০০৮ সালে ঢাকার বাইরে রংপুরে আরও একটি হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। ডা.ওয়াছিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন পরিচালিত অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠান এটি। হাইপারটেনশন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য এসব সেন্টার থেকে বিভিন্ন সময় বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা, র্যালি, ফ্রি রক্তচাপ পরিমাপ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার চিকিত্সা গ্রহণের সুযোগ থাকায় সারাদেশে এ ধরনের হাইপারটেনশন সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।