সুস্থ থাকার উপায়

বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

সুস্থ থাকার উপায় - বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র থেকে নেয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু লেখা…

আর্থ্রাইটিস ও চিকিত্সা

আর্থ্রাইটিস একটি গ্রিক শব্দ। মানুষের শরীরের জোড়ার অনেক রোগ বা সমস্যাকে একসঙ্গে আর্থ্রাইটিস বলা হয়। আর আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে জানার আগে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। মানুষের শরীরে বহু জয়েন্ট বা জোড়া রয়েছে এবং এসব জোড়া তিন ধরনের। এসব জোড়ায় যদি কোনোভাবে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হয়, তখন ডাক্তারি ভাষায় তাকে আর্থ্রাইটিস বলা হয়। আর্থ্রাইটিসকে অনেকে বাতরোগ বলে থাকে।

আর্থ্রাইটিস কি?
আর্থ্রাইটিস হলে এক বা একাধিক জোড়ায় ব্যথা হবে। জোড়া ফুলে যেতে পারে, গরম হতে পারে, নড়াচড়ায় ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। রোগীর দৈনন্দিন কাজকর্ম ও চলাফেরায় অসুবিধা হয়, অনেক সময় জ্বরও আসতে পারে, পাশাপাশি শরীরে ক্লান্তিবোধ, অবসাদ, হতাশা ও অনিদ্রা দেখা দিতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে আস্তে আস্তে রোগী তার দেহের জোড়ার কর্মক্ষমতা বা নড়াচড়ার ক্ষমতা হারায় এবং জোড়া সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে রোগী পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। অনেক সময় দীর্ঘদিন রোগে ভুগে শরীরের মাংসপেশিগুলোও শুকিয়ে যেতে পারে।

আর্থ্রাইটিস একশ’রও বেশি ধরনের দেখা যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অস্টিও আর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এনকালজিং স্পন্ডাইলসিস, গাউট, জুভেনাইল অ্যাথ্রাইটিস যা বাচ্চাদের হয়, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস, রি-অ্যাকটিভ আর্থ্রাইটিস, সেপটিক আর্থ্রাইটিস, স্ক্লেরোডারমা, এসএলই। এছাড়া অন্যান্য রোগের কারণেও আর্থ্রাইটিস হতে পারে।

আর্থ্রাইটিস সাধারণত বয়স্কদের বেশি হয়। যে কোনো বয়সের যে কোনো বর্ণের যে কোনো সংস্কৃতির মানুষের আর্থ্রাইটিস হতে পারে। তবে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের আর্থ্রাইটিস বেশি হয়।

চিকিত্সা
আর্থ্রাইটিস জোড়ার রোগ এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস রয়েছে। যদি কারও এ জাতীয় সমস্যা হয়, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিত্সক এক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষা করাতে পারেন, যেমন—রক্ত পরীক্ষা, সেরোলজি পরীক্ষা, এক্সরে। তাছাড়া রোগের লক্ষণ দেখেও বোঝা যায়, কী জাতীয় আর্থ্রাইটিস হয়েছে। আর্থ্রাইটিসের প্রকারভেদে কিছু ওষুধ খেয়ে যেতে হয়, যেমন—ব্যথানাশক এনএসএআইডিএস, ডিজিজ মডিফাইং ওষুধ, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম। আর্থ্রাইটিসে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর চিকিত্সা। এতে অনেকাংশে রোগীর সমস্যা ব্যথা-বেদনা দূর হয় এবং রোগী স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও কাজকর্ম করতে পারে।

প্রয়োজনবোধে ইলেকট্রোমেগনেটিক রেডিয়েশন, আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, ইন্টারফেরেন সিয়াল থেরাপি ছাড়াও বিভিন্ন নিয়মমাফিক কৌশলগত ব্যায়াম, মেনুয়্যাল থেরাপি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীর সমস্যা বহুলাংশে লাঘব হয় এবং অস্থিসন্ধি স্বাভাবিকভাবে কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। ফলে রোগী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে তার জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক সময় ফিজিওথেরাপি চিকিত্সার পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থোসিসের প্রয়োজন হতে পারে। ঠাণ্ডায় আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ও সমস্যা বেড়ে যায়, তাই ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকতে হবে। কুসুম গরম পানির সেক ব্যথা নিরাময়ে কার্যকর চিকিত্সা, কুসুম গরম পানিতে গোসল করা যেতে পারে।

ফিজিওথেরাপি চিকিত্সকের নির্দেশমত ব্যায়াম নিয়মিত করতে হবে। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে হবে। অত্যধিক পরিশ্রম করা যাবে না। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, ওজন বেড়ে গেলে ওজন কমিয়ে ফেলতে হবে। খাদ্যতালিকায় চর্বি ও আমিষজাতীয় খাবার পরিমাণে কমাতে হবে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি আর্থ্রাইটিস রোধে ভালো ভূমিকা পালন করে, তাই ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ওষুধের দোকান থেকেও কিনে খাওয়া যেতে পারে।

দুধ, ডিম, মাছের কাঁটা, হাড়গোড়, বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে। নিচু জিনিস, যেমন পিঁড়ি বা ফ্লোরে অনেকক্ষণ বসে থাকা যাবে না। অত্যধিক ভারী বোঝা বহন করা যাবে না। ফোম বা জাজিমের বিছানায় শোয়া যাবে না, অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। মদ্যপান, ধূমপান বা তামাকজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা যাবে না।

ডা. মো. সফিউল্যাহ্ প্রধান; লেখক : পেইন ও ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ; মোহাম্মদপুর, ঢাকা